জলজট-যানজটের নগরী কুমিল্লা

কুমিল্লা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বেশিরভাগ সড়কে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা হেঁটে চলাও দায় হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায় ড্রেনসহ রাস্তাঘাট। বড় বড় গর্তসহ খানা-খন্দকে ভরা এসব সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলছে রিকশা থেকে শুরু করে ছোট-বড় যানবাহন। এদিকে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড ও নিম্নমানের কাজের কারণে এসব বরাদ্দ কার্যত নগরবাসীর দুর্ভোগ নিরসনে তেমন কোনো কাজে আসছে না বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন নগরীর বিশিষ্টজনরা। বেহাল রাস্তাঘাটে যানজট ও জলজটের কবলে পড়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজনকে। এদিকে গত অর্থবছরের জুন মাস শেষ হয়ে গেলেও নগর উন্নয়নের পরিকল্পনাসহ এ পর্যন্ত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়নি। 

 
২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা হয়। পরে ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন মো. মনিরুল হক সাক্কু। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর কোটি কোটি টাকার কাজ কাগজে-কলমে সম্পন্ন হলেও বাস্তবে কাজ হয়েছে সামান্যই। ফলে নগরবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সেই আগের মতোই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাস্তা, ড্রেন, কালভার্ট, বাজার উন্নয়ন, সড়ক আলোকিতকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহসহ শতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হলেও দৃশ্যত সড়ক বাতি, ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করাসহ উল্লেখ করার মতো উন্নয়ন তেমন নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণসহ জনদুর্ভোগ নিরসনের জন্য প্রাপ্ত বরাদ্দের সিংহভাগই ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে মেয়র-কাউন্সিলরসহ সরকারদলীয় ও বিএনপির ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাঝে। এতে বরাদ্দের সদ্ব্যবহার না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নগরবাসী। ফলে গত সাড়ে ৩ বছরেও পাল্টায়নি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের চিত্র। পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলেও নগরবাসীর দুর্ভোগ সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। কার্যত পৌরসভার আদলেই চলছে এ সিটির কার্যক্রম।   
 
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সড়ক সংস্কারে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও অপরিকল্পিতভাবে কাজ করার কারণে এবং দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ ও অলিগলির প্রায় সব কয়টি রাস্তাঘাট খানা-খন্দে ভরে গেছে। নগরীর বেশ কয়েকটি রাস্তা এখন পরিণত হয়েছে ড্রেনে এবং এসব রাস্তাঘাটে ছোট-বড় গর্ত হয়ে কোনো কোনো স্থান কূপের আকার ধারণ করেছে। নগরীর পুলিশ লাইন-কান্দিরপাড় সড়ক, ইপিজেড-দক্ষিণ চর্থা-বড়পুকুরপাড়-তালতলা চৌমুহনী সড়ক, ফৌজদারি-কালিয়াজুরী সড়ক, কান্দিরপাড়-ধর্মপুর চৌমুহনী সড়ক, শাসনগাছা-ধর্মপুর সড়ক, ধর্মপুর-অশোকতলা, দৌলতপুর-ধর্মপুর সড়ক, রানীর বাজার সড়ক, অশোকতলা-রেলস্টেশন-শাসনগাছা সড়ক, মধ্যম আশ্রাফপুর ইয়াছিন মার্কেট সড়ক, মগবাড়ি-বিষ্ণপুর-ছোটরা সড়ক, সুজানগর-বিবির বাজার সড়কসহ নগরীর অধিকাংশ সড়কেরই বেহাল দশা। সামান্য বৃষ্টিতে বিভিন্ন সড়কে হাঁটু থেকে কোমর পানি পর্যন্ত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে ড্রেনের ময়লা-আবর্জনাযুক্ত দুর্গন্ধময় পানি ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে ঢুকে পড়ে। জানা যায়, নগরীতে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় এবং নিয়মিত ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা অপসারণ না করায় দ্রুত পানি নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পুলিশ সুপারের বাসভবন এলাকা, স্টেডিয়াম, ঈদগাহ সড়ক, টাউন হল মাঠ, কান্দিরপাড় ভিক্টোরিয়া কলেজ সড়ক, দক্ষিণ চর্থা-ইপিজেড সড়ক, রেসকোর্স, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্প এলাকা, দৌলতপুর, ধর্মপুর, অশোকতলা, রানীর বাজার, ঝাউতলা, চৌধুরীপাড়া, আদালতপাড়া, কালিয়াজুরি, দক্ষিণ চর্থা, মুরাদপুর, বাগানবাড়ি, মহিলা কলেজ  রোড, বাগিচাগাঁও, কাশারিপট্টি, নগরীর টাউন হল মাঠসহ নগরীর বেশিরভাগ সড়কই সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে নগরীর চর্থা এলাকার সহিদ উল্লাহ, জালাল উদ্দিন, মুন্সেফবাড়ির সাকি, ঠাকুরপাড়ার ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া জানান, কোটি কোটি টাকা খরচ করে অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের কাজ করার কারণে নগরবাসী জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। ঈদুল ফিতরের দিন নগরীর প্রতিটি এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীকে ঈদের নামাজ পড়তে হয়েছে মসজিদে। এছাড়া বৃষ্টিতে নগরীর রাস্তা তলিয়ে যাওয়ার ফলে অনেকে ঘর থেকে বের হতে না পারায় ঈদের নামাজও পড়তে পারেননি। 
 

এদিকে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছর শেষ হয়ে গেলেও এ পর্যন্ত নগর উন্নয়নের পরিকল্পনাসহ চলতি বছরের বাজেট ঘোষণা করা হয়নি। এতে চলতি বছরে নগরবাসী তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু সাংবাদিকদের বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে আমি নিজে মাঠে নেমে কাজ করছি। বিভিন্ন স্থানে ড্রেন নির্মাণের কাজ চলার কারণে সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলেও দ্রুত পানি সরে গেছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়নে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বাজেট প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাজেট ঘোষণা করা হবে।