গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাইল আওয়ামী লীগ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদাত বার্ষিকী সার্বজনীনভাবে পালনের জন্য গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মাতৃভূমি এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। দ্বিতীয় কেউ এটি হতে পারে না। তিনি বলেন, এবার বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাত বার্ষিকী পালনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৪০ দিনব্যাপী কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। আমরা আশা করি,    দেশের সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এবং গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে জাতির পিতার শাহাদাত বার্ষিকী পালন করবে।

 
গতকাল বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের সম্পাদক, প্রকাশক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ কথা বলেন। আগামী ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাত বার্ষিকীকে সামনে রেখে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
 
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই শোকের মাস আগস্টে গণমাধ্যমগুলো নিজস্ব স্বকীয়তা থেকেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনুষ্ঠান করুক কিংবা সংবাদ প্রকাশ করুক। বঙ্গবন্ধুকে জনমানুষের কাছে পৌঁছে দিক। তাদের এই সৃজনশীলতা থেকে নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি আমরাও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারবো। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আমরা কোনো কর্মসূচি কিংবা অনুষ্ঠান চাপিয়ে দিতে চাই না। চাপিয়ে দেয়া কোনো কিছু মৌলিকও হয় না। গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা সম্পর্কে একাধিক সাংবাদিকদের নানা অভিযোগের জবাবে হাস্যোজ্জ্বল সৈয়দ আশরাফ বলেন, প্রতিদিন মিডিয়াতে কথা বললে জনপ্রিয়তা বাড়ে না, বরং কমে। আর যত কম কথা বলা যায়, ততই ভুল হওয়ার সুযোগ কম থাকে। প্রতিদিন কথা বললে একটি মিথ্যা কথা ঢাকতে অনেক মিথ্যা কথাও বলতে হয়। তাছাড়া আমি যদি প্রতিদিন কথা বলি, তাহলে আমাদের দলের অন্য নেতারা সুযোগ পাবেন না- এটা তো ঠিক না।  
 
গণমাধ্যমকে সত্ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করার আহ্বান জানিয়ে সৈয়দ আশরাফ বলেন, সবসময়ের মত সরকার এখনো গণমাধ্যমের পাশে রয়েছে। আমরা চাই স্বাধীন ও সার্বভৌম সাংবাদিকতা। আর গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলা-মামলা ও নির্যাতনের বিষয়ে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন পড়লে সরকার তা অবশ্যই করবে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আশরাফ বলেন, বঙ্গবন্ধুই হচ্ছেন একটি ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনদিনই আসতো না। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, দেশের স্বাধীনতা। গণমাধ্যমের প্রতি তাই অনুরোধ- জাতির পিতার মতো মহাপুরুষের দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামী জীবনের কথা দেশের নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরুন। শুধু লেখনীর মাধ্যমেই নয়, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেও ছোট ছোট শিশুর সামনে বঙ্গবন্ধুর আমরকীর্তি তুলে ধরতে হবে। 
 
বঙ্গবন্ধুকে দেশের সব মানুষের জাতির পিতা উল্লেখ করে সৈয়দ আশরাফ বলেন, বঙ্গবন্ধু কেবল আওয়ামী লীগের নয়, দেশের সব মানুষের জাতির পিতা। ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও শাহাদাত বাষির্কী এখনো সার্বজনীন হতে পারেনি। তবে ইতিহাস কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না। একদিন আমরাও হয়তো বা আমাদের জাতির পিতাকে সার্বজনীন করতে পারবো, সবাই মিলেই তার জন্ম ও শাহাদাত বার্ষিকী পালন করতে পারবো। 
 
মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা সাংবাদিকদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, কুহেলিকার অন্ধকার থেকে এখন সৈয়দ আশরাফ প্রদীপের আলোতে উদ্ভাসিত হয়েছেন। এটা সত্যিই আনন্দের। সভায় প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে যথেচ্ছ ব্যবহার এবং শোক দিবস উপলক্ষে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ইতিমধ্যেই ১৫ আগস্টকে ঘিরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। কারো নামে এমন চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ছবি যথেচ্ছ ব্যবহার রোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। 
 
বঙ্গবন্ধুকে সার্বজনীন করা এবং বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকী দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে জাতীয়ভাবে পালনের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেন, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রচার দেখে মনে হয় তিনি কেবলই আওয়ামী লীগের সম্পত্তি। তবে বঙ্গবন্ধুকে কোন দলের একক সম্পদ হিসাবে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতির সম্পদ। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও শাহাদাত বার্ষিকী জাতীয়ভাবে পালন করতে হলে আওয়ামী লীগকে আরো দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে মানুষের আত্মার আত্মীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রয়োজনে জামায়াত ছাড়া সকল রাজনৈতিক দল থেকে নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় কমিটি করে একটা ঐতিহাসিক প্রোগ্রাম করারও পরামর্শ দেন তারা।
 
সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতির সম্পদ। তিনি আমাদের সকলের চেতনা। তিনি কোন দলের সম্পদ নয়। যে মিথ্যা ধারণা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এতদিন দেয়া হয়েছিল, সেটি এখন কাটতে শুরু করেছে তা জেনে আমরা আনন্দিত। উত্তরা ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী আমলাতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য সৈয়দ আশরাফের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা শৃঙ্খলিত গণমাধ্যম নয়, সুশৃঙ্খল গণমাধ্যমের ভূমিকা রাখতে চাই।
 
বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, পোস্টার-ফেস্টুনসহ নানা স্থানে বঙ্গবন্ধুর ছবি যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে আমাদের কষ্ট লাগে। ডিইউজে সভাপতি আলতাফ মাহমুদও বঙ্গবন্ধুর ছবি যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে সুনির্দিষ্ট গাইড লাইন প্রণয়নের দাবি জানান। মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধু শুধু আওয়ামী লীগের সম্পতি হতে পারে না। তিনি সমস্ত বাঙালি জাতির সম্পদ। এখন শুধু দলের পোস্টার-ব্যানারেই নয়, বাজার কমিটিতেও বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব করে পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুকেই খাট করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সার্বজনীন অনুষ্ঠান করা যাচ্ছে না শুধু রাজনীতির কারণে।
 
বিএফইউজে’র সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ এখন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারের সব অর্জনগুলো দলের মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় মুসলিম লীগের মতো অনেক বড় দলও হারিয়ে গেছে। তাই দল ও সরকার যেন এক হয়ে না যায় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
 
কালের কণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন তরুণ প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে ভালভাবে জানাতে পাঠ্য পুস্তকে বঙ্গবন্ধুকে ভালভাবে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে শুধু ১৫ আগস্টের শোক দিবসের মধ্যে সীমাবন্ধ না রেখে সারা বছর বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যমে তাকে স্মরণ করতে হবে।
 
সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাই তার মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য একটি জাতীয় কমিটি করতে হবে। যেখানে সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা থাকবেন। সেখানে সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
 
মতবিনিময় সভায় সিনিয়র সাংবাদিকদের মধ্যে আরো উপস্থিত ও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, সমকালের প্রকাশক এ কে আজাদ, সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মনিরুজ্জামান, ইনকিলাব সম্পাদক এম এম বাহাউদ্দিন, একাত্তরের মোজাম্মেল হক বাবু, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, সময় টেলিভিশনের আহমেদ জুবায়ের, দৈনিক ইত্তেফাকের মলয় পাঁড়ে, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের খালেদ মুহিউদ্দিন, আরটিভির মোর্শেদ আলম এমপি, বাংলাভিশনের মোস্তফা ফিরোজ, যমুনা টেলিভিশনের জাকারিয়া কাজল, এটিএন নিউজের মুন্নী সাহা, দেশ টিভির অলোক গুপ্ত প্রমুখ। 
 

আওয়ামী নেতাদের মধ্যে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, ড. হাছান মাহমুদ, আফজাল হোসেন, মৃণাল কান্তি দাস, সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।