আর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সকলের জন্য উন্মুক্ত হবে মাইক্রোসফটের বহুল প্রতীক্ষিত উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের নতুন সংস্করণ উইন্ডোজ ১০। তবে এর প্রাক্কালে প্রযুক্তি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনার এবং ইন্টারন্যাশনাল ডাটা কর্পোরেশন (আইডিসি) জানাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী পিসির বিক্রি চলতি বছরের দ্বিতীয় চতুর্ভাগে এসে ২০১৩ সালের পর সবচেয়ে বেশি পরিমাণে কমেছে। গার্টনার এবং আইডিসির এই দুই প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী পিসি বিক্রির বর্তমান সময়ের খোঁজ-খবর জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব
বিশ্বব্যাপী কম্পিউটিং ডিভাইসের ক্ষেত্রে গত এক দশকে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর আগের সময়টাতে কম্পিউটিং ডিভাইস হিসেবে ডেস্কটপ কম্পিউটারের ছিল একাধিপত্য। পরে ল্যাপটপ এসে সেই জায়গাটি অনেকটাই দখল করে নেয়। তবে এই ক্ষেত্রে মূল পরিবর্তনের সূচনা হয় স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট পিসির আগমনে। এর মধ্যে বর্তমান সময়ে প্রফেশনাল সব কাজের জন্যও ট্যাবলেট পিসির ব্যবহার শুরু হওয়ায় ক্রমেই ডেস্কটপ পিসির বিক্রি কমতে থাকে। তারপরেও ডেস্কটপ পিসির বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পরিবর্তন আসতে সময় লেগেছে। গত চার বছরের চিত্রে এসে মূলত পিসি বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করে। এরই মধ্যে গার্টনার এবং আইডিসি জানাচ্ছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় চতুর্ভাগে এসেও (এপ্রিল-জুন) পিসির বিক্রি আগের বছরের তুলনায় বড় হারে কমেছে। শুধু তাই নয়, আসছে সপ্তাহে উইন্ডোজ ১০ বাজারে আসার পর পিসির বিক্রি খানিকটা বাড়লেও সার্বিকভাবে চলতি বছরে পিসি বিক্রির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় কমে যাওয়ার অনুমানের কথাই জানিয়েছে দুই প্রযুক্তি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
বিক্রি কমেছে ১০ শতাংশ
গার্টনারের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় চতুর্ভাগে এসে পিসি বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮.৪ মিলিয়ন ইউনিট। ২০১৪ সালের একই সময়ের তুলনায় যা গার্টনারের হিসেবে ৯.৫ শতাংশ কম। গার্টনার বলছে, ২০১৩ সালের তৃতীয় চতুর্ভাগের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পর এটিই পিসি বিক্রির পরিমাণে সবচেয়ে বড় পরিমাণের হ্রাস। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের শেষে এসেও পিসি বিক্রির পরিমাণ সার্বিকভাবে ৪.৪ শতাংশ পরিমাণ কমে যাবে বলে অনুমান জানিয়েছে গার্টনার।
পরিমাণের দিক থেকে কিছুটা ভিন্ন হলেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে আইডিসির প্রতিবেদনেও। তাদের হিসাবে চলতি বছরের দ্বিতীয় চতুর্ভাগে পিসি বিক্রি হয়েছে ৬৬.১ মিলিয়ন ইউনিট, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৮ শতাংশ কম। এর আগে বছরের শুরুর দিকে আইডিসি জানিয়েছিল, এই সময়ে এসে পিসির বিক্রি কমে যেতে পারে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু তাদের হিসাবের চাইতেও পিসি বিক্রি কমে গেছে।
পিসি বিক্রি কমে যাওয়ার নেপথ্যে
পিসি বিক্রিতে এমন নেতিবাচক চিত্রের নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণকে উল্লেখ করেছে গার্টনার। এর মধ্যে শুরুতেই তারা উল্লেখ করেছে ডলারের দামের কথা। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে পিসি বিক্রিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে বলে মন্তব্য করেছে গার্টনার। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে গার্টনারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে উইন্ডোজ এক্সপির সাপোর্ট শেষ হওয়ার পর হঠাত্ করে পিসির বাজারে উল্লফন ঘটানোকে। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম উইন্ডোজ এক্সপির সমর্থন বন্ধ করে দেওয়া হলে এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পিসির বাজারের বিক্রি বেশ খানিকটা বেড়ে যায়। ওই সময়ের হঠাত্ এই পিসি বিক্রি বৃদ্ধির পর মূলত পিসির বিক্রি স্থিতিশীল হয়ে যাওয়াতেই তুলনামূলকভাবে বাজারে বিক্রির পরিমাণে নেতিবাচক অবস্থান তৈরি হয়। সর্বশেষ কারণ হিসেবে উইন্ডোজ ১০-এর জন্য পিসির বাজারে অপেক্ষার কথা তুলে ধরেছে গার্টনার। আসছে সপ্তাহেই উইন্ডোজ ১০ বাজারে আসার কথা রয়েছে। তবে উইন্ডোজ ১০ নিয়ে এই আলোচনা চলে আসছে গত কয়েক মাস ধরেই। ফলে নতুন অপারেটিং সিস্টেমের সাথে হালনাগাদ হওয়ার জন্যই মূলত অপেক্ষায় রয়েছে পিসির বাজার। আইডিসির প্রতিবেদনেও মূলত এই বিষয়গুলোকেই উল্লেখ করা হয়েছে পিসি বিক্রি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে।
স্থিতিশীল হবে পিসির বাজার
পিসির বাজারে বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার ঘটনাকে খুব বেশি বিস্ময়কর বলে মনে করছে না দুই বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই। পিসি বিক্রির কারণ হিসেবে তারা যেসব ঘটনাকে উল্লেখ করেছে, সেগুলোকে সাময়িক হিসেবেই অভিহিত করা হয়েছে। ফলে এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে পিসির বাজার স্থিতিশীলতার দিকেই এগিয়ে যাবে বলে মনে করছে গার্টনার ও আইডিসি। বিশেষ করে ডলারের দাম আবার স্থিতিশীল হয়ে উঠলে পিসি বিক্রির পালে হাওয়া লাগবে বলে তাদের অনুমান। তাছাড়া উইন্ডোজ ১০ বাজারে চলে আসলে তখন আবার পিসি বিক্রি নতুন গতি লাভ করবে বলেও মনে করছে গার্টনার ও আইডিসি।
পিসি নির্মাতা হিসেবে এখনও শীর্ষস্থানে লেনোভো
বিশ্বব্যাপী পিসির বাজারে এখন শীর্ষস্থানটি দখল করে রেখেছে লেনোভো। আইডিসি এবং গার্টনার—উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনেই শীর্ষস্থানে রয়েছে চীনের এই পিসি নির্মাতা। চলতি বছরের দ্বিতীয় চতুর্ভাগে তাদের পিসি বিক্রির পরিমাণ ১৩.৪ মিলিয়ন ইউনিট। এই পরিমাণ চলতি বছরের প্রথম চতুর্ভাগের তুলনায় এক শতাংশ বেশি হলেও তা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে সাত শতাংশ কম। গার্টনার জানাচ্ছে, লেনোভো এতদিন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের বাজার বৃদ্ধিতে মনোযোগী থাকলেও এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয় দেশগুলোতেও নিজেদের বাজার বাড়িয়ে নিতে সমর্থ হয়েছে।
এদিকে ১২.২ মিলিয়ন পিসি বিক্রি করে পিসি নির্মাতা হিসেবে দ্বিতীয় স্থান সুসংহত রাখতে সমর্থ হয়েছে এইচপি। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এইচপির পিসি বিক্রিও কমেছে এ বছরে এসে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের পিসি বিক্রি ৭ শতাংশ কমলেও বৈশ্বিক হিসেবে এই পরিমাণ কমেছে ১০.৪ শতাংশ। গার্টনারের তালিকাতেও তারা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে; যদিও গার্টনারের প্রতিবেদনে তাদের পিসি বিক্রির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১১.৯ মিলিয়ন।
গার্টনার ও আইডিসি—উভয় তালিকাতেই ৯.৫ মিলিয়ন পিসি বিক্রির হিসেবে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ডেল। অবশ্য তাদের পিসি বিক্রির পরিমাণও আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৮.৭ শতাংশ। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেলের পিসি বিক্রির পরিমাণ একটু বেশি কমেছে বলে জানিয়েছে গার্টনার।
পিসি বিক্রির পরিমাণে অন্যদের নেতিবাচক চিত্রের দেখা মিললেও অ্যাপলের চিত্রটি ভিন্ন। চলতি বছরের দ্বিতীয় চতুর্ভাগে তারা পিসি বিক্রি করেছে ৫.১ মিলিয়ন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬.১ শতাংশ বেশি। অ্যাপলের স্থান তাই আইডিসির তালিকায় হয়েছে চতুর্থ। এ ছাড়াও এই তালিকার পরের দুইটি অবস্থানে রয়েছে এসার এবং আসুস।