পবিত্র ঈদুল ফিতরের সময় ঘরে ফেরা লোকজন ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে যাবার সময় সারাদেশে ঘটে চলেছে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা। গত সাত দিনে এ ধরনের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। এর মধ্যে কেবল গত দুই দিনেই মারা গেছেন ৬৭ জন। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন আরো ১৭০ জন। ফলে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, কেন হঠাত্ করে দুর্ঘটনার হার বেড়ে গেল।
দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সঠিক সময় হাইওয়ের মেরামত কাজ হয়নি। আর একটানা বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ঈদের পর সিংহভাগ চালক ছুটি নেয়ায় অদক্ষ ও সৌখিন চালকের হাতে স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিয়েছেন অনেক মালিক। পাশাপাশি মহাসড়কে হঠাত্ করে অনুমোদনবিহীন নসিমন, করিমন, ইজি বাইক, অটোরিকশার চলাচল বেড়ে গেছে। এরা চলাচলের নিয়মকানুনকে পরোয়া করে না।
হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অভিযোগে গত তিন দিনে দেড় হাজার যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হবে। এই বছরই তা সংসদে পাস করা হবে। গতকাল শুক্রবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৮ লেনের কাজ পরিদর্শনে এসে তিনি এসব কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, বর্তমানে প্রচলিত আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা বেরিয়ে যায়। প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হয় না। তিনি আরো বলেন, এবারের ঈদযাত্রা ভালো হয়েছিল। সড়কের অবস্থা ভালো থাকলেও ঈদের পরে যেসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে এগুলোকে সড়ক দুর্ঘটনা বলবো না, বরং এগুলো ‘রোড ক্র্যাশ’।
বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত একজন চালকের গাড়ি চালানোকে আমি স্বাভাবিক ঘটনা বলবো না। কারণ চালক অনেক সময় ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থায় থাকে। দূর পাল্লায় মাত্র একজন চালক রাখা হয়। অথচ চালকও তো একজন মানুষ। তারও শরীরে ক্লান্তি ও পরিশ্রম বোধ আছে। এই ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত চালক বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছিল।
এ পর্যন্ত সড়কের কারণে কোথাও কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে মন্ত্রী মন্তব্য করেন। রাস্তার ঝুঁকিপূর্ণ মোড় প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সড়ক-মহাসড়কে ১৪৪টি দুর্ঘটনা প্রবণ মোড়গুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর জন্য ১৬৫ কোটি টাকার প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়েছে, যার ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বাকিগুলোর দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে। এতে হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী অটোরিকশা ও নসিমন। এগুলোর বিরুদ্ধে আগামী ১ আগস্ট থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম বলেন, ঈদের পরবর্তী সময় মহাসড়ক অনেকটা ফাঁকা ছিল। এই সুযোগের অপব্যবহার করে ট্রাক, বাস, মাইক্রোবাস চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো শুরু করে। একারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে গতকাল থেকে দুর্ঘটনার ধরন পাল্টেছে। গতকাল থেকে মহাসড়কে গাড়ির চাপ বেড়েছে। এ কারণে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশই মুখোমুখি। তিনি বলেন, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর অভিযোগে গত তিন দিনে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে দেড় হাজার যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান মনে করেন, এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বৃষ্টি। তাছাড়া ঈদের সময় অনেক চালক ছুটিতে যাওয়ায় অদক্ষ চালকরা গাড়ি চালাচ্ছে। আবার অনেক প্রাইভেটকার মালিকরা তাদের চালক ছুটিতে থাকায় সখ করে নিজে গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন। তারা নিয়ম কানুন মানে না। ফলে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। তিনি আরো বলেন, কোথাও কোথাও রাস্তার ক্রুটির কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ১৭টি বাক্ ছিল। এসব বাকে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটতো। কিন্তু সেগুলোকে সোজা ও ডিভাইডার দেয়ার কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশ কমে গেছে।
ঢাকা জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল্লাহ ছদু বলেন, তিনি গতকাল ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌঁছেছেন। বৃষ্টিতে রাস্তার বেশ কয়েকটি স্থানে খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে। তাই আমি বলব বেহাল রাস্তাই দুর্ঘটনা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, কোন চালকই ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটায় না। চালকদের বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সে সুযোগ তাদের খুব একটা জোটে না। আর মহাসড়কে রিকশা, ভ্যান, করিমন, নসিমন, অটোরিকশা, রাস্তার পাশে দোকানপাট বসানো দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তিনি আরো বলেন, বাসের ছাদে যাত্রী ওঠা নিষেধ। এটা দেখার দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশের। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। টাঙ্গাইলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ছাদে যাত্রী ওঠার কারণেই চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।