চাঁদার টাকায় উঠতি নেতারা কোটিপতি

ফুটপাথের চা দোকানি থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ি সবাইকেই চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা ছাড়া যেন সাতক্ষীরায় কোন নিস্তার নেই। রাজনৈতিক নেতাদের অনুগতদের এই চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ মানুষ। এখন বহু উঠতি নেতা চাঁদার টাকায় কোটিপতি বনে গেছেন। সম্প্রতি সাতক্ষীরার সদর, কলারোয়া, তালা ও শ্যামনগর উপজেলা ঘুরে উঠতি নেতাদের চাঁদাবাজির এই ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলছেন না। সবার মধ্যেই এক ধরনের শঙ্কা। অথচ সাতক্ষীরাতে আওয়ামীলীগের কোন অফিস নেই।

 
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কলারোয়া উপজেলার দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি। এই দুই নেতার আয় ব্যয়ের হিসাব এখন আর মেলে না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও সরাসরি কেউ কিছু বলে না। এই এলাকার সংসদ সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টির মোস্তফা লুত্ফুল্যা। ফলে দুই নেতা এলাকার সব কিছুর হর্তাকর্তা। তাদের নজরের বাইরে কোন কিছু নেই।
 
এই এলাকার বাসিন্দা ও বিগত নির্বাচনে সংসদ সদস্য প্রার্থী বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সরদার মুজিব ইত্তেফাককে বলেন, হেন কোন অপকর্ম নেই যা ঐ দুই নেতা করছেন না। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে সবকিছুই হচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণে। এখন এখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্তা নেই।
 
কলারোয়ায় সরেজমিন দেখা যায়, সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের দুইজন নৈশ্য প্রহরীকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ ৭ জনকে আটক করে। ইতিমধ্যে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের রুম থেকে তার অনুসারি মনি ও গোলামকে আটক করা হয়। ‘ডাকাত’ নামে পরিচিত নেতার অনুসারী হেলাতলার আনচার আলীকেও আটক করা হয়।
 
স্থানীয় লোকজন জানান, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারত থেকে আসা মাদক ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সোনার বার নিয়ন্ত্রণের কমিশনও পাচ্ছেন এখানকার নেতারা। সোনা চোরাচালানে বড় অংকের অর্থ লগ্নীও আছে নেতাদের। সোনার পাশাপাশি গরু প্রতি একশ টাকা করে বখরা দিতে হয়। এ থেকে প্রতি মাসে অবৈধ আয় প্রায় ৪০ লাখ টাকার মতো। উপজেলা শিক্ষা বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ১৩৮ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে নৈশ প্রহরী কাম পিওন নিয়োগ দেয়া হয়েছে টাকার বিনিময়ে। এ ছাড়া ৪৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে। এসব স্কুলের ১৮৪ জন প্রার্থীর কাছ থেকে মাথা পিছু দুই থেকে চার লাখ করে টাকা ঘুষ নেয়া হয়। উপজেলার হঠাত্গঞ্জ মাদ্রাসায় দুইজন জামায়াত নেতাকেও শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে টাকা নিয়ে। স্থানীয় এমপি আওয়ামী লীগ দলীয় না হওয়াতে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাজে কোন বাধাও নেই।
 
কলারোয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি ফিরোজ আহম্মেদ স্বপন ইত্তেফাককে বলেন, রাজনীতির মাঠে যাদের ঠাঁই নেই তারাই অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের এসব অভিযোগ একেবারেই ঠিক নয়। ভাইস চেয়ারম্যান   আমিরুল ইসলাম লাল্টু ইত্তেফাককে বলেন, আওয়ামী লীগ বড় সংগঠন। এখানে কর্মীদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ থাকবে। তারপরও আমরা সংগঠিত।
 
এদিকে তালা উপজেলার এক শীর্ষ নেতা এখন উপজেলার হর্তাকর্তা। তিনি যা বলেন তাই সেখানে হয়। ব্যত্যয় ঘটলে লাঞ্ছিত হতে হয়। সম্প্রতি তদ্বির না শুনে বৈধভাবে জমির রায় দেয়ায় তার পক্ষের লোকদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে তালা উপজেলা সেটেলমেন্টের একাধিক কর্মকর্তাকে। এসব ঘটনায় পুলিশ মামলাও নেয়নি।
 
উপজেলার দু’শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশ প্রহরী কাম পিওন নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। এ ছাড়া ৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে। এসব নিয়োগে প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে উপজেলা চেয়ারম্যানের নাম বলে তার সাঙ্গপাঙ্গরা মাথা পিছু ২ থেকে ৩ লাখ করে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে উপজেলা আওয়ামী লীগ এখন বিভক্ত। প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব জড়িয়ে পড়েছে দলের তৃণমূল পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের কারণে ১২টি ইউনিয়নের একটিতেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিততে পারেননি। 
 
তালা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ঘোষ সনত্ কুমার সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,  যারা অনিয়ম করছে তারাই অভিযোগ দিচ্ছে। কিছু কুচক্রি মহল দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে বিভিন্ন অনিয়ম কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। তবে এখনো পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। আবেদন পড়েছে মাত্র। কেউ টাকা নেয়ার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেবো। অন্যান্য অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।
 
সাতক্ষীরা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও শ্যামনগরের এমপি জগলুল হায়দারের ঘনিষ্টজনরা সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান ও সাংবাদিক সিদ্দীকসহ অনেককে মারপিট করেছে। কিন্তু পাননি কোন প্রতিকার। এদিকে গত বছর সংসদ নির্বাচনের আগে সাতক্ষীরা হয়ে পড়েছিল এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষ। এখন ওই সব সহিংসতার মামলায় আসামির তালিকায় নাম দেয়ার ভয় দেখিয়ে, মামলার র্চাজশিট থেকে বাদ দেয়ার নামে বা আসামি না ধরতে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করেছে পুলিশ। সঙ্গে যোগ দিয়েছেন পুলিশের ঘনিষ্ট কিছু নেতাও। শ্যামনগরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় উঠতি নেতারা ব্যস্ত মত্স্য ঘের দখল ও টেন্ডারবাজিতে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডারবাজি ও মত্স্য ঘের দখলের ভাগের টাকা পৌঁছে যায় উপর মহলেও। 
 
এমপি জগলুল হায়দার ইত্তেফাককে বলেন, ‘যে সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হয়েছেন তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ ছিল। তালা উপজেলাতেও ওই কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হয়েছেন। বিশেষ করে টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে আমার জিরো টলারেন্স। কেউ এই অভিযোগ করতে পারবে না। আর আওয়ামী লীগ অনেক বড় সংগঠন। এখানে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। সবকিছু আমার নজরে থেকে হয় না। জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে আমি ব্যবস্থা নেই।’
 

এদিকে সাতক্ষীরার রাজনীতির মাঠে অস্তিত্ব সংকটে আছে বিএনপি-জামায়াত। সাতক্ষীরার আওয়ামী লীগকে মাঝে মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে দেখা গেলেও দীর্ঘকাল আর দেখা যায় না বিএনপি-জামায়াতকে। সরকার বিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হলেও তা পালনে কোনো নেতাকর্মীকে এখন আর রাজপথে দেখা যায় না। সবাই আত্মগোপনে।