‘চোখের সামনে দেখলাম পড়ে যাচ্ছেন স্যার’

একজন রাষ্ট্রপতি, একজন বিজ্ঞানী, একজন শিক্ষক, একজন লেখক, একজন ভালো বক্তা। তিনি ভারতের মিসাইল ম্যান এপিজে আব্দুল কালাম। যার তুলনা তিনি নিজেই। সারাটা জীবন কাজের মধ্যে ডুবে থেকেছেন। কাউকে একটু খাটো করে দেখেননি একটিবারের জন্যও। জীবনের শেষ দিনটাও তেমনি কাটিয়েছেন তিনি। তাঁর জীবনের শেষ দিনটির কথা নিয়ে গতকাল ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে তাঁর দীর্ঘদিনের এই সফরসঙ্গীর কথায় উঠে এসেছেন চিরচেনা আব্দুল কালাম। যার চোখের সামনেই কথা বলতে বলতে পড়ে যান আব্দুল কালাম।

 
সফরসঙ্গীর সে দিনের বর্ণনায়, গুয়াহাটি থেকে শিলং গোটা পথই স্যারের চোখ ওই জিপসিতেই আটকে রইল। ঠিক জিপসি নয়, নিরাপত্তা দিয়ে যাওয়া ওই গাড়িতে মেশিনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক কনস্টেবলের দিকে। বিমানবন্দর থেকে কিছুটা এগিয়েছে আমাদের গাড়ি, স্যার আমাকে বললেন, ওই বেচারা কি এভাবেই সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? আমাকে বার বার অনুরোধ করছিলেন, ওয়ারলেসে খবর পাঠাও না! ওকে বসতে বলতে বলো। শেষে এক রকম বাধ্য হয়েই আমি যোগাযোগ করলাম ওয়ারলেসে। কিন্তু কোন লাভ হল না। নিয়মে আটকে গেল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আমরা শিলং পৌঁছলাম। স্যার কিন্তু প্রথমেই ওই নিরাপত্তাকর্মীর খোঁজ নিলেন। তাঁর নাম এসএ লাপাং। স্যার ডাকছেন শুনে এক লাফে হাজির। লম্বা, সুঠাম যুবক কাছে আসতেই তাঁর সঙ্গে হাত মেলালেন স্যার। ক্ষমা চাইলেন ওই কনস্টেবলের কাছে। বললেন, আমার জন্য এতটা পথ এভাবে আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হল! এরপর তাঁকে অবাক করে দিয়ে স্যার বললেন, নিশ্চয়ই ক্লান্ত লাগছে? আমার সঙ্গে বসে কিছু খেয়ে যান। এমন কথা অনেকটাই স্তম্বিত হলেন লাপাং। তারপর বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, স্যার, আপনার জন্য তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনায়াসে দাঁড়াতে পারি!
 
এমনটাই ছিলেন স্যার। স্যার মানে এপিজে আব্দুল কালাম। তাঁর মৃত্যুর পর এতগুলো ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আমার ঘোর কাটছে না! গত ৬ বছর ধরে আমি ছিলাম দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর সফরসঙ্গী। ছায়াসঙ্গীও বলা যেতে পারে। তাঁর বইয়ের সহ-লেখকও। লাপাং-এর সঙ্গে কথা বলার পর বরাবরের পছন্দের চা-পকোড়া খেয়েছিলেন তিনি। ছাত্রদের বসিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন না। তাই, ক্লান্ত শরীরেও সময় নষ্ট না করে হলের দিকে রওনা হলেন।
 
হলে পৌঁছে বরাবরের মতো মাইক্রোফোনটা ঠিক করে দিয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। বললেন, ফানি গাই, ‘‘আর ইউ ডুইং ওয়েল”? ৬ বছর ধরে চেনা বাক্য। একই সংলাপ। কেবল সুর শুনে বুঝতে হবে, মুড কেমন! জবাব দিলাম, ‘‘ইয়েস অল ফিট, গো অ্যাহেড।’’ ব্যস, সেই আমার সঙ্গে শেষ কথা। এরপর তিনি ছাত্রদের সঙ্গে কথা শুরু করলেন। বললেন, কেমন আছ তোমরা? আগেও তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।’ হার্ভার্ড-এমআইটি যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা শুরু করতেই হঠাত্ দেখলাম, স্টেজ থেকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছেন তিনি। চোখ বন্ধ। তখন সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট (ভারতের সময়)। ওখান থেকে হাসপাতালে পৌঁছতে মিনিট পাঁচেক লেগেছিল। তার কিছুক্ষণ পরেই জানলাম, দূষণ-হিংসার পৃথিবী ছেড়ে মিসাইল ম্যান তাঁর নভোযানে চেপে রওনা দিয়েছেন নতুন দেশের উদ্দেশে।
 

দিল্লি থেকে গুয়াহাটি আড়াই ঘণ্টা, সেখান থেকে শিলং ফের আড়াই ঘণ্টা। পাঁচ ঘণ্টার এই সফরে বহু বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল স্যরের সঙ্গে। সকালেই খবর পেয়েছিলেন, পঞ্জাবে জঙ্গি হানা হয়েছে। খুব চিন্তিত ছিলেন বিষয়টি নিয়ে। শিলং আইআইএম-এ তাঁর ভাষণের বিষয় ছিল ‘ক্রিয়েটিং আ লিভেবেল প্ল্যানেট আর্থ’। স্যার বলছিলেন, মানুষের তৈরি কারণগুলিই এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে হারে হিংসা, দূষণ ও মানুষের হঠকারি কাজকর্ম বাড়ছে তাতে আর বড় জোর তিরিশ বছর এই দুনিয়ায় থাকা যাবে। তখনো কী জানতাম, বক্তা নিজেই মাত্র তিন ঘণ্টা পরেই পৃথিবী ছাড়বেন!