৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস
জিলফুল মুরাদ ও আমিরুজ্জামান
অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যপূরণে বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মাস্টারকার্ড ইনডেক্স অব উইমেন আন্ট্রেপ্রেনিউরস এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবসা ক্ষেত্রে মোট মালিকদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ৩১.৬ শতাংশ, অর্থাত্ ৩১.৬ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা প্রতিনিয়ত দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য সরাসরি কাজ করছেন। এসডিজি-৫ বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছে নারীরা। এছাড়া আরো ১১টি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের সাথে নারীরা জড়িত।
গ্রামীণ নারীরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রভাবে নিজস্ব উদ্যোগে শুরু করেছে তাদের কাজ। বিশেষ করে, ঘরোয়াভাবে যেসব কাজ করা যায় যেমন-বুটিক, সেলাই, পার্লারসহ নানা কাজে আগ্রহী হচ্ছে গ্রামীণ নারীরা। আর এই সব ক্ষুদ্র প্রয়াসের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তারা যেন নিপুণ হাতে গড়ে তুলছেন দেশের অর্থনীতি। তবে, দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে নারী উদ্যোক্তাদের সামনে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন ওমেন এনটারপ্রিনিওয়ার্স নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন (ওয়েন্ড)। সংগঠনের সভাপতি নারী উদ্যোক্তা ড. নাদিয়া বিনতে আমিন আসন্ন বাজেটে সংগঠনের পক্ষ থেকে আট দফা দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তা তথা নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ও স্বপ্ন পূরণ সম্ভব নয়। দেশের অর্থনীতিতে নারীদের এতো সব সম্ভাবনা ও অবদান থাকার পরও নারী উদ্যোক্তারা কাঙ্খিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ প্রদানের নীতিমালা প্রণয়ন করলেও নারী উদ্যোক্তারা এই সুবিধা পাচ্ছেন না। ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত জটিলতা নানাবিধ শর্তের বেড়াজাল এবং উচ্চ সুদের কারণে প্রতিনিয়ত পুঁজি সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে। এসব সমস্যা ও জটিলতা নারী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা। আমরা চাই সরকার নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশে আরও সুবিধা প্রদান করুক।
দেশের উত্তরের জেলা নীলফামারীর সৈয়দপুরে ঢেলাপীর উল্টরা আবাসন প্রকল্পে গ্রামীণ নারীদের এমন প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মতো। যখানে নদী ভাঙ্গা, আশ্রয়হীন অভাবী আর হতদরিদ্র মানুষের বসবাস। এই প্রকল্প এলাকায় একটু উঁকি দিলেই চোখে পড়ে থোঁকায় থোঁকায় গোল হয়ে বসে কাজ করছেন নারীরা। প্রায় প্রতিটি ঘরের সামনে বসানো কাঠের তৈরি ফ্রেম। মেয়েরা নিপুণ হাতে সুঁই- সুতা দিয়ে চুমকি, পুঁথি আর জরির কাজ করছেন। তৈরি করছেন নানা নকশার জরির শাড়ি, ওড়না, থ্রি-পিস ও ব্লাউজ। কয়েক বছর ধরে এখানকার ১ হাজার পরিবার এ কাজ করে জীবনধারণ করছেন। অভাবকে জয় করেছেন তারা। শুধুমাত্র হাতের কাজ করেই স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন সংসারে।
শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা সুযোগ পেয়েছে লেখাপড়ারও। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখানকার শত শত নারী। নীলফামারী জেলার ঘনবসতিপূর্ণ সৈয়দপুরের ভাসমান মানুষের চাপ, বানভাসী, ভিটেমাটিহারা মানুষকে আশ্রয় দিতে শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ঢেলাপীর এলাকায় ২০০৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থাপন করা হয় উত্তরা আবাসন প্রকল্প। সেখানে আশ্রয় পায় ১ হাজার হতদরিদ্র পরিবার। আবাসনের বেবী আক্তার, কাজলী, পারভীন, শাহিদা জানান, তাদের শাড়িসহ চুমকি, পুঁতি ও জরি সরবরাহ করা হয়। কাজ শেষে মজুরি বাবদ তারা শাড়ি প্রতি ৬শ থেকে ৭শ টাকা করে পান। একটি শাড়িতে হাতের কাজ শেষ করতে অন্তত ১৫ দিন সময় লেগে যায়। তারা কেউ এ ব্যাপারে কোথাও প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেননি।
অন্যের কাজ দেখে নিজেরাই দক্ষতা বাড়িয়েছেন। তাদের কাজ করা শাড়ির চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি দিন দিন বাড়ছে এ কর্মে নিয়োজিত নারীর সংখ্যাও। আর এ কাজ করে অনেক নারীই এখন স্বাবলম্বী। আবাসন সমবায় ও পুলিশিং কমিটির সভাপতি মতিন আলম জানান, যখন আবাসনে কাজ ছিল না, তখন আমাদের না খেয়ে দিন কাটাতে হতো। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। নারী কর্মীরা জানায়, একটি শাড়ির কাজ ৭ দিনের মধ্যে শেষ করে আয় হয় ৭শ থেকে ৮শ টাকা। প্রতিমাসে আমাদের আয় হয় ৩ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। শাড়ির কাজ করে আমাদের পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। এখন আমরা দুই বেলা খেতে পারি, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও পারি।
এ শিল্পের শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ওয়াকিল আহমেদ বলেন, নারীরা এ কাজ করে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করছে। কেউ কেউ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও গড়ে তুলেছে। তিনি কারিগরদের মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বলেন, কাজের পরিবেশ সৃষ্টি হলে আরো অনেকে একাজে এগিয়ে আসবেন।
সৈয়দপুর কারুশিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, এ শিল্পের প্রসার ঘটায় এলাকার বহু নারী আত্মনির্ভরশীল হয়েছে। সমিতির মাধ্যমে নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো হচ্ছে। প্রতিনিয়ত এ কাজে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। নকশী করা শাড়ি, কামিজ, হিজাব ও বোরখা, ওড়না প্রভৃতি অর্ডার অনুযায়ী ঢাকার ফ্যাশন হাউসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছেন এসব নারী। তিনি বলেন, শুধু ঢেলাপীর আবাসন প্রকল্প নয় পুরো শহর ও গ্রাম এলাকার হাজারো নারী এসব কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
প্রতি বছরের মতো এবারে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন হতে যাচ্ছে। এবারের নারী দিবসের স্লোগান ‘সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো/ নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়’। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সারা দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নারী দিবস পালনের নির্দেশনা দিয়েছে।