ঘূর্ণিঝড় কোমেনের আঘাতে বিস্তীর্ণ উপকুলীয় অঞ্চলে সব কিছু থমকে গিয়েছিল। আবার নড়াচড়া শুরু হয়েছে। মানুষ বাড়ি-ঘরে ফিরে যাচ্ছে। বন্দরে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফেরি ও লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
ভোলার মনপুরায় একটি ট্রলার ডুবির ঘটনায় ১৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। একই জেলার চরফ্যাশনে ২৭ জেলেসহ দুইটি ট্রলারের কোন খোঁজ নেই। স্থল উঠে আসার পর কোমেনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নেত্রকোনার খালিয়াজুরিতে হাওরে মাছ ধরার সময় প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে কাছু বর্মন নামে একজন জেলে মারা গেছেন।
মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, সাগরের মোহনায় মাছ ধরতে গিয়ে ২৯ জুলাই রাত ১১টায় ১৮ জেলেসহ একটি ট্রলার ডুবে যায়। তারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বাড়ি ভোলার মনপুরার উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড চরগোয়ালিয়া গ্রামে।
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, ভোলার চরফ্যাশনের চর কুকরী মুকরীর মনুরা ঘাট থেকে মাছ ধরতে সাগরে যাওয়া দুইটি ট্রলার এখনো ফিরে আসেনি। চরফ্যাশনের আবদুল্যাহপুর ইউনিয়নের মহিউদ্দিন মাঝি ও বোরহান উদ্দিনের গংগাপুর ইউনিয়নের গনি বদ্দারের ইঞ্জিন চালিত মাছ ধরা ট্রলার দুইটিতে ২৭জন জেলে রয়েছেন। তাদের ভাগ্যে ঘটেছে তা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উত্কণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, ঝড়ের আতঙ্কে সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এখনো আতঙ্কে রয়েছেন। অনেকেই আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়ছেন না। সেখানে খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার টানা বর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর বৃহত্তর আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, পাথরঘাটা এবং বাকলিয়া এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। আগ্রাবাদের মহেশখাল সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার ৯৫ শতাংশ বাড়ির একতলায় পানি প্রবেশ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটও রক্ষা পায়নি। জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে ৩/৪ ফুট পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকাসমূহ হচ্ছে সিডিএ আবাসিক এলাকা, ফকিরহাট, হালিশহর, বড়পোল, ছোটপোল, এক্সেস রোড, বেপারিপাড়া, আবিদেরপাড়া, বল্লিপাড়া, শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা এবং পুলিশ লাইন। চান্দগাঁও পুলিশ ফাঁড়ি পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করলে শুক্রবার সকালে ফাঁড়ির অস্ত্রশস্ত্র, বিছানাপত্র, কাগজপত্রসহ পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে পিকভ্যানে তুলে মূল থানায় নিয়ে আসা হয়। ফাঁড়িটি ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়।
অপরদিকে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বাকলিয়া থানার বাস্তুহারা কলোনী, বলিরহাট, ইসহাইক্যার পুলের পশ্চিমাংশ, মিয়াখান নগরসহ আরো কিছু এলাকা নিমজ্জিত হয়। চট্টগ্রামে গতকাল বিকাল তিনটা পর্যন্ত চব্বিশ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১১৬ মিলিমিটার।
মংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে মংলা বন্দরের কার্যক্রম। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) কাজী গোলাম মোক্তাদের শুক্রবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ৫ নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারির পর বন্দরে আবারো কাজ শুরু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুইটি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করেছে। পশুর চ্যানেলে অবস্থানরত বাকি তিনটি জাহাজে কাজ শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে বৃষ্টিপাতের কারণে মংলা দুপুর পর্যন্ত বন্দরে অবস্থানরত জাহাজের হ্যাচ (খোল) খুলতে না পারায় পণ্য ওঠা-নামা (খালাস) বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, মংলার কয়েকটি এলাকার কাঁচা ঘরবাড়ির বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয় থেকে নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে, বন্দরের পশুরসহ সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোতে জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে দেড় থেকে ২ ফুট বেড়েছে। অন্যদিকে, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. কামাল উদ্দিন জানান, সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে আশ্রয় নেওয়া জেলেরা শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করছিল। বনের ভেতরের নদ-নদীর পানির উচ্চতা আগের চেয়েও ২ ফুটের মতো বেড়েছে।
খুলনা অফিস জানায়, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ২৯ নম্বর পোল্ডারের চাঁদগড়-জালিয়াখালী বুড়িভদ্রা নদীতে ভাটার সময় প্রায় ৫০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টায় এ ঘটনা ঘটে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে ডুমুরিয়া সদর, ভান্ডারপাড়া, সাহস ও শরাফপুর ইউনিয়নের লাখ মানুষ।
শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, কাওড়াকান্দি-শিমুলিয়ায় ঘাটে লঞ্চ-স্পিডবোট চলাচল শুরু হলেও যাত্রীরা এখনো ফেরিতেই পার হতে চাচ্ছেন। এজন্য ফেরিঘাটে ভীড় বেশি।
তালা (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, কপোতাক্ষের উপচে পড়া পানি ও অতি বর্ষণে তলিয়ে গেছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। এ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টি ইউনিয়নের ৪৫ গ্রামের প্রায় ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উপজেলা সদরের অধিকাংশ অফিসে পানি উঠেছে।
অতিবর্ষণে বন্যা পরিস্থতি ও পানিবন্দী হওয়ার খবর দিয়েছেন, আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি, সীতিকুন্ড সংবাদদাতা ও উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা।