আগামী বছর শিক্ষার্থীশূন্য হতে পারে দেড়শ’ কলেজ

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানির রাতইল আইডিয়াল কলেজ। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর কলেজটিতে ১৮ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু শুরু থেকেই বেতন ভাতা না দেয়ায় শিক্ষক সংখ্যা কমতে থাকে। বর্তমানে শিক্ষক আছেন ৫ জন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বেতন ভাতা না পাওয়ায় তারাও কলেজে আসা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। নিয়মিত ক্লাস হয় না, শিক্ষা উপকরণ নেই। নামে গভর্নিং বডি থাকলেও সদস্যরা কলেজটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। গত বছর প্রতিষ্ঠানটিতে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু এবার একজনও ভর্তি হয়নি। কলেজের অধ্যক্ষ এস এম জুলফিকার বলেন, শিক্ষকদের বেতন ভাতা না দিলে তারা কেন আসবে, আর শিক্ষক না থাকলে কেন ছাত্র ভর্তি হবে। এবারের মতো আগামী বছরও যদি কেউ ভর্তি না হয়, তবে শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে পড়বে কলেজটি।

 
গোপালগঞ্জের রাতইল আইডিয়াল কলেজ একমাত্র উদাহরণ নয়। এই প্রতিষ্ঠানটির মতো দেশের প্রায় দেড়শ কলেজ রয়েছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। এমনকি ভর্তির জন্য কেউ পছন্দের তালিকায়ও রাখেনি। আবার পছন্দের তালিকায় রেখে ভর্তি হয়নি এমন কলেজও রয়েছে এই তালিকায়। কেউ এসব কলেজ পছন্দ করেনি। ভর্তি পদ্ধতি অনলাইনের মাধ্যমে উম্মুক্ত হওয়ায় কলেজগুলোর শিক্ষার মানের এই দৈন্যদশা উন্মোচিত হয়েছে।
 
মাগুরার পাল্লা বহুমুখী স্কুল এ্যান্ড কলেজ। ২০১২ সালের প্রতিষ্ঠা করা হয় এই প্রতিষ্ঠানটি। এখানে গত বছর ভর্তি হওয়া ২৬ জন ছাত্র রয়েছে। এই স্কুল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরাও এবার এখানে ভর্তি হয়নি। অন্যদিকে, জামালপুর জেলার ইসলামপুরের এসএনসি আদর্শ কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৩ সালে। কলেজটি এমপিওভুক্তির জন্য চেষ্টা করলেও তা হয়নি।  একসময় উদ্যোক্তারা কলেজটির অর্থসহায়তা বন্ধ করে দেয়। ফলে শিক্ষক নেই। এবার একজন শিক্ষার্থী এ কলেজে ভর্তি হয়নি। এদিকে, নড়াইলের মুলিয়া পাবলিক কলেজটি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষক কর্মকর্তা আছেন ১৩/১৪ জন। এখানে গতবছর ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী রয়েছে ১৬ জন। যা আয় হয় তা দিয়ে একজন শিক্ষকেরও বেতন ভাতা দেয়া সম্ভব নয়। বেতন ভাতা না থাকায় শিক্ষকরা কলেজে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। আর ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীরাও আসছে না। ফলে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা পড়েছে চরম বিপাকে।
 
কেবল মফস্বলে নয়, খোদ রাজধানীতেও এমন কলেজ রয়েছে। বাইরে চাকচিক্য থাকলেও শিক্ষার মানে যে পিছিয়ে তা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা পর্যালোচনা করলেও বোঝা যায়। রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত জাস্ট ইন্টারন্যাশনাল কলেজ। ২০০৮ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও শিক্ষার মান ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কলেজের শিক্ষক পরিচয়ে রিয়াজুল বলেন, অনলাইনে ভর্তির কারণে এবার ছাত্র পাইনি।
 
একই অবস্থা উত্তরা লিডস কলেজেরও। শিক্ষার্থী না পাওয়া কলেজের মধ্যে ঢাকায় আছে ১৪টি, কুমিল্লায় ৫টি, রাজশাহীতে ১৩টি, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে ১৬টি, কুমিল্লা বোর্ডে পাঁচটি, যশোরে নয়টি এবং সিলেটে পাঁচটি। এসব প্রতিষ্ঠানে কেউ ভর্তি হয়নি। আগামী বছরও এমন ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থী শূন্য হবে কলেজগুলো।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন সুযোগ সুবিধা অবকাঠামো বিবেচনায় না এনে এসব কলেজগুলোকে পাঠদানের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। উদ্যোক্তারা এমপিও পাওয়ার আশায় এসব কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু যখন এমপিওভুক্তি হচ্ছে না তখন তারাও পিছিয়ে যায়। বেতন ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। একসময় শিক্ষকরাও পেটের তাগিদে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েন।
 

রফিকুল নামের একজন শিক্ষক বলেন, মফস্বলে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি কম। কমপক্ষে ৪ থেকে ৫শ শিক্ষার্থী থাকলে তাদের দেয়া টিউশন ফি দিয়ে শিক্ষকদের বেতন ভাতা দেয়া যায়। কিন্তু মফস্বলের শিক্ষার্থীরাও এখন শহরমুখী। অনলাইনে আবেদন করে মফস্বলের একজন শিক্ষার্থী ভালো মানের কলেজে ভর্তির সুযোগ পেতে পারে, যেটা আগে সম্ভব ছিল না। এ কারণে মফস্বলের নিম্নমানের কলেজগুলো শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে যাচ্ছে। আমিনুল ইসলাম নামে একজন অভিভাবক বলেন, কলেজে যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকলে শিক্ষার্থী কেন ভর্তি হবে। শিক্ষাবোর্ড এমন মানের প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি কেন দিল তা এক বড় প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কলেজের মান বৃদ্ধি করতে না পারলে স্থায়ীভাবে এসব কলেজ বন্ধ করে দেয়া উচিত।