এবার খুলনায় পৈশাচিক কায়দায় শিশু হত্যা

সিলেটের শিশু রাজন হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খুলনায় পৈশাচিক কায়দায় এক শিশু শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। শিশুটির নাম রাকিব হাওলাদার (১৩)। বর্বর নির্যাতনের এক পর্যায়ে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়া শক্তিশালী কমপ্রেসার মেশিনের নল রাকিবের পায়ুপথে ঢুকিয়ে ‘হাওয়া’ দেয় তারা। এতে তার পেট বেলুনের মতো ফুলে এক পর্যায়ে ভেতর থেকে ফেটে যায়। পরে চিকিত্সার জন্য ঢাকায় নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

 
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গতকাল মঙ্গলবার হত্যাকাণ্ডে জড়িত মোটর সাইকেলের গ্যারেজ মালিক শরীফ (৩৫), তার মা বিউটি বেগম (৫৫) ও শরীফের সহযোগী মিন্টুকে (৪০) গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে। পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হতবাক খুলনার মানুষ।
 
নির্মম ‘প্রতিশোধ’:এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্র জানায়, নগরীর টুটপাড়া কবরখানা রোডের বাসিন্দা শরীফের মোটর সাইকেলের গ্যারেজ ‘শরীফ মোটর্স’-এ কাজ করত শিশু রাকিব। কিন্তু সম্প্রতি সে আরো ভালো সুযোগ-সুবিধা পেয়ে শরীফের কাজ ছেড়ে পিটিআই মোড়ে নাসিরের গ্যারেজে কাজ নেয়। এতে ‘অপমান’ বোধ করে শরীফ। ফলে শিশুটির প্রতি ক্ষুব্ধ হয় সে। শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টু এর প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করে। সোমবার বিকাল ৫টার দিকে রাকিব তাদের গ্যারেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ডেকে ভেতরে নেয় দুজন। সেখানে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এর পরই তাদের মাথায়  এক পৈশাচিক পরিকল্পনা আসে। মোটর সাইকেলের চাকায় যে মেশিন দিয়ে হাওয়া ঢুকানো হয় সেই মেশিনের  নল শিশুটির মলদ্বারে ঢুকিয়ে মেশিন চালু করে দেয় তারা। এতে দ্রুতগতিতে হাওয়া ঢুকে তার পেট বেলুনের মতো ফুলে গিয়ে নাড়িভুঁড়ি ফেটে যায়।এই ঘটনায় ভয় পেয়ে শরীফ ও মিন্টু মুহূর্ষু শিশুটিকে প্রথমে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিত্সা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাত ৯টার দিকে তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাত ১১টার দিকে ঢাকায় নেয়ার পথে রাকিবের মৃত্যু হয়।
 
গণপিটুনি, বিক্ষোভ: এ পৈশাচিক খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গ্যারেজ মালিক শরীফ, তার মা বিউটি বেগম ও শরীফের সহকারী মিন্টুকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পুলিশ তাদের উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি করেছে।
 
অপরদিকে রাকিব হত্যার প্রতিবাদে গতকাল মঙ্গলবার সকালে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোড অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল এবং শরীফের গ্যারেজ ভাংচুর করে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওহেদুর রহমান দিপু এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিহতের বাড়িতে যান।
 
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসএম অজিয়র রহমান ও ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আউয়ালও শিশুটির বাড়িতে যান। উত্তেজিত এলাকাবাসী এ সময় হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে।
 
‘টাকা নয়, বাজানরে ফিরায়া দ্যান’: অজিয়র রহমান ও আব্দুল আউয়াল নিহতের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দিতে চাইলে রাকিবের মা লাকি বেগম তা প্রত্যাখ্যান করে  আর্তনাদ করতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমি টাকা চাই না, আমার মণি কত কষ্ট করে আমারে টাকা আয় করে দিয়েছে। পারলে আমার বাজানরে আপনারা ফিরায়া দ্যান।’ এভাবে আর্তনাদ করতে করতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
 
মায়ের পাশে বসা রাকিবের একমাত্র ছোট বোন মিমি চিত্কার করে বলতে থাকে, ‘ওরা আমার ভাইয়ারে কত কষ্ট দিয়ে মেরেছে, পেট থেকে রক্ত বের করে ছাড়ছে। ওদের ফাঁসি চাই আমি।’
 
নিহত রাকিবের মা লাকি বেগম বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার পদ্মপুকুর এলাকায়। তিনি ছোট বেলা থেকেই খুলনায় বসবাস করছেন। তার দুই সন্তানের জন্মও খুলনায়। রাকিব গ্রামের একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। তারপর সংসারে অভাব-অনটনের কারণে সে পড়ালেখা ছেড়ে শরীফের গ্যারেজে কাজ নেয়। কিন্তু সেখানে ঠিকমতো বেতন না দেয়া এবং কথায় কথায় মারধরের কারণে ৭/৮ মাস আগে সেখানকার কাজ ছেড়ে দেয়। পরে পার্শ্ববর্তী পিটিআই মোড়ের নাসিরের গ্যারেজে ভালো সুযোগ পেয়ে কাজ নেয়। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষরূপী পিশাচগুলো আমার বুকের ধনকে নিষ্ঠুরভাবে খুন করল।
 
তিনি আরো বলেন, সোমবার বিকালে তার ছেলেকে নির্যাতন করা হয়। রাত ৮টার দিকে খবর পেয়ে তিনি খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। সেখানে মাকে দেখে রাকিব বাঁচার আকুতি জানায়। এ সময় সেখানে থাকা শরীফের মা বিউটি বেগম তাকে অন্য কক্ষে নিয়ে যান। বিউটি বেগম তাকে ছেলের সাথে আর কথা বলতে দেননি। নিহত রাকিবের বাবা আলম হাওলাদার বলেন, অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাকিবকে নিয়ে ঢাকায় রওনা হলে পথে তার মৃত্যু হয়। তিনি ছেলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
 

খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার বিশ্বাস বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মঙ্গলবার রাকিবের পিতা  নূরুল আলম হাওলাদার গ্যারেজ মালিক শরীফ, তার মা বিউটি বেগম ও তার সহযোগী মিন্টুকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ইতোমধ্যে আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এদের মধ্যে গণপিটুনির শিকার গ্যারেজ মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টু খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে রয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।