বাংলাদেশের আয়তন মাত্র ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার, কিন্তু জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি। এই দেশে এখন প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় বসবাস করিতেছেন প্রায় সোয়া এক হাজার মানুষ। ম্যাকাও, মোনাকো, সিঙ্গাপুর, হংকং—এই রকম কয়েকটি ক্ষুদ্রদ্বীপ ও নগররাষ্ট্রের কথা বাদ দিলে বাংলাদেশের জনঘনত্ব এখন পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বেশি। ইহা বহু বত্সরের চর্চিত বিষয় যে, দেশে জনসংখ্যার নেতিবাচক চাপ পড়িতেছে সর্বত্র।
বাংলাদেশের সর্বত্রই মানুষ বেশি, আর সকল কিছুই কম। চাষাবাদের জায়গা কম, বসবাসের জায়গা কম, রাস্তাঘাটের জায়গা কম, কলকারখানা স্থাপনের জায়গা কম, হাসপাতালে রোগীদের জন্য জায়গা কম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য জায়গা কম, শিশুদের খেলাধুলার জায়গা কম। আর জায়গা কম বলিয়াই জায়গাজমি লইয়া মারামারি-খুনাখুনি বেশি। জায়গা কম বলিয়াই ভরাট হইয়া যাইতেছে নদ-নদী, খাল-বিল, দিঘি-পুকুর। বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, জায়গার অনুপাতে মানুষের সংখ্যা বেশি হইলে তাহার স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুরই ঘাটতি পড়ে। বাংলাদেশের সবচাইতে জনবহুল নগরী ঢাকা। যেই নগরীতে সর্বাধিক ৩০ লক্ষ লোক সুষ্ঠুভাবে বসবাস করিতে পারে, সেইখানে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করিতেছে ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ। ইহা ছাড়া প্রতিদিনই এই নগরীতে ২০ হইতে ৩০ লক্ষ লোক আসিয়া কাজ শেষে ফিরিয়া যায়। অর্থাত্ ১ কোটি ৩০ লক্ষ অতিরিক্ত লোক প্রতিদিন ঢাকা নগরীতে চাপ প্রয়োগ করিতেছে। এই অতিরিক্ত লোকের জন্য নাই থাকিবার ঘর, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। উপরন্তু একশত শতাংশ অবকাঠামো ও বরাদ্দের উপর প্রায় চারশত শতাংশ মানুষ সবকিছুতে ভাগ বসাইয়া পুরা মহানগরের জীবনযাপন ব্যবস্থাকে দুর্বিষহ করিয়া তুলিতেছে। যেই কারণে ঢাকা মহানগরী এখন পৃথিবীর অন্যতম বসবাসের অনুপযোগী নগরীতে পরিণত হইয়াছে। ঢাকার বাহিরেও তুলনামূলক সকল জায়গাতেই জনঘনত্বের অসহনীয় চাপ লক্ষ করা যায়।
আমরা দেখিয়াছি, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুর তাহার সমুদ্রতলের মাটি, পর্বত ও অন্যান্য দেশ হইতে মাটি সংগ্রহ করিয়া দেশটির স্থলভাগের আয়তন বৃদ্ধি করিয়াই চলিয়াছে। ১৯৬০-এর দশকে দেশটির আয়তন ছিল প্রায় ৫৮২ বর্গকিলোমিটার, বর্তমান ইহার আয়তন ৭২১ বর্গকিলোমিটার এবং ২০৩৩ সাল নাগাদ ইহার পরিমাণ বৃদ্ধি পাইবে আরও ১০০ বর্গকিলোমিটার। অথচ বিগত ১০ বত্সরে প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশের জলসীমায় নূতন ২৬টি দ্বীপ ও চর জাগিয়াছে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায় ঠেঙ্গার চর ও জাহাজ্জ্যার চরে আনুমানিক ১৮ হাজার ৯১৩ একর জমি জাগিয়া উঠিয়াছে। ইহা ছাড়া বঙ্গোপসাগরে জাগিয়া ওঠা ১৯টি দ্বীপের মোট জমির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৮৩ একর। এই সবগুলি দ্বীপই জনশূন্য। দীর্ঘদিন ধরিয়া শুধুই ‘ডোবা চর’ হিসাবে পরিচিত বেশ কয়েকটি চরভূমি ইতোমধ্যে স্থায়ী ভূখণ্ডে পরিণত হইয়াছে। একই ধরনের আরও প্রায় ২০টি ‘নতুন ভূখণ্ড’ এখন স্থায়িত্ব অর্জনের পথে। কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলভাবে জনবসতিও গড়িয়া উঠিতেছে। এইসকল নূতন চরকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাইতে হইবে। সঠিক পরিকল্পনা ও যথাযথ অবকাঠামোর মাধ্যমে জনসংখ্যার বিপুল চাপ ছড়াইয়া দিতে হইবে সর্বত্র।