জাহিদ রিপন একজন গুণী নির্দেশক, অভিনেতা, সংগঠক, গবেষক, নাট্য-মূকাভিনয় প্রশিক্ষক। নাট্যসংগঠন স্বপ্নদলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশনের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ‘নাটক ও নাট্যতত্ত্ব’ বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে পিএইচডি করছেন। দেশে নাট্যবিষয়ক পড়ালেখা করে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে তিনিই প্রথম যোগ দেন। বর্তমানে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তাকে নিয়ে লিখেছেন পীযূষ সিকদার
নাটকে কিভাবে জড়ালেন?
পিতার চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শৈশব কেটেছে আমার। প্রত্যক্ষ করেছি, দেশের চিরায়ত সংস্কৃতির নানা বৈচিত্র্য, নানাবিধ পরিবেশনামূলক শিল্পকীর্তি। এভাবে ক্রমশ আমার অন্তরে গভীর নাট্যানুরাগ আর শিল্পবোধ তৈরি হয়েছিল। তাই খুব ছোটবেলা থেকেই আমার থিয়েটারে সম্পৃক্ত হওয়া। আর নিয়মিত গ্রুপ থিয়েটার নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি ১৯৮৫ থেকে, ফরিদপুর সুনিয়ম নাট্যচক্রের মাধ্যমে। পরবর্তীতে থিয়েটার স্কুল (১ম ব্যাচ), নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ফরিদপুর থিয়েটার (আমন্ত্রণে ছাত্রাবস্থার দীর্ঘসময়), স্বপ্নদল (২০০১) আর দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষকের অধীনে নানাবিধ প্রশিক্ষণ নিয়েছি।
আচার্য সেলিম আল দীন সম্পর্কে কিছু বলুন?
উপনিবেশ-উত্তরকালে হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারায় বাঙালির নিজস্ব ও স্বকীয় নাট্যরীতি বিষয়ক সচেতনতা প্রথম লক্ষ করা যায় রবীন্দ্রনাথে। এরপর বিচ্ছিন্ন কিছু প্রয়াস প্রত্যক্ষ করা গেলেও প্রকৃতপক্ষে সেলিম আল দীনের হাতেই তা দিগন্তবিস্তৃত হয়েছে। তাই নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সাহচর্যে আমাদের প্রকৃত পুনর্জন্ম হয়েছে, আমরা লাভ করেছি বাংলা নাট্যরীতি কিংবা এ ভূখণ্ডের নিজস্বতার শক্তি সম্পর্কিত গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গিসহ সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার দারুণ সাহস! তা-ই তো সেলিম আল দীন সত্যিকারভাবেই আমাদের শিল্পপিতা!
স্বপ্নদলের প্রযোজনাসমূহে সেলিম আল দীনের শিল্পভাবনার ছায়া দেখি—বিষয়টি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
আমার সৌভাগ্য যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে এবং পরবর্তীতেও নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সংস্পর্শে তার প্রয়াণ-অবধি প্রায় ১৭ বছর থাকতে পেরেছিলাম। তাই বাংলার হাজার বছরের নাট্যরীতি, উপনিবেশের প্রভাবে এর অনভিপ্রেত মধ্যখণ্ডন এবং উপনিবেশ-পরবর্তী বর্তমান সময়ে এর পরিশীলনের প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতি সম্পর্কিত তার যে দর্শন-দৃষ্টিভঙ্গি গুরু-শিষ্য পরম্পরায় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি, তারই ব্যবহারিক রূপ প্রদানের চেষ্টা করা হয় আমাদের নাট্যসংগঠন স্বপ্নদলে।
স্বপ্নদলের স্লোগান—‘ঐতিহ্য অন্বেষণে শৈল্পিক শুদ্ধতা’, অর্থাত্ ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই আমাদের প্রকৃত ও প্রত্যাশিত শিল্পলাভ সম্ভব। তা-ই আমি দায়িত্ব নিয়েই সবিনয়ে বলতে পারি, নাট্যতত্ত্ব বিভাগের মাধ্যমে যে নাট্যদর্শনের কথা সেলিম আল দীন বলতে চেয়েছিলেন, সীমিত সামর্থ্য সত্ত্বেও তারই ব্যবহারিক-নমুনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে স্বপ্নদলের প্রযোজনাগুলো।
আগামী ১৮ আগস্ট নাট্যাচর্য সেলিম আল দীনর জন্মবার্ষিকী। দিবসটি ঘিরে আপনাদের আয়োজন?
নাট্যাচার্যের প্রয়াণের পরে শিল্পপিতার প্রতি অনিবার্য দায়মোচন এবং নবীন প্রজন্মের কাছে তার নাট্যদর্শন পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তার জন্ম ও প্রয়াণবার্ষিকী ঘিরে আমরা স্বপ্নদল ্এরমধ্যে ১১টি নাট্যোত্সব সম্পন্ন করেছি। এবার নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ৬৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা আগামী ১৮-১৯ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন জন্মোত্সব-২০১৫’ আয়োজন করতে যাচ্ছি। এতে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জীবন-কর্ম-দর্শন সম্পর্কিত আলোচনা, সেমিনার, জাবিতে নাট্যাচার্যের সমাধি আভিমুখে স্মরণ-শোভাযাত্রাসহ পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ, বাংলা নাট্যরীতির নমুনা হিসেবে স্বপ্নদল প্রযোজনা সেলিম আল দীনের কালজয়ী ‘হরগজ’ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’-এর প্রদর্শনী প্রভৃতি থাকছে।
অনেকে বলে থিয়েটারে সংকটকাল চলছে— এ নিয়ে কিছু বলুন?
সঙ্কট আর সম্ভাবনা নিয়েই থিয়েটার শিল্পের বসবাস। এমন কোনো সময়ের কথা ইতিহাসে পাওয়া যাবে না যখন থিয়েটার সঙ্কটবিহীন ছিল। কিন্তু সম্ভাবনাও সর্বদা তার পাশে পাশে বিরাজ করেছে। একনিষ্ঠভাবে কাজের মাধ্যমে সকল সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এখনকার থিয়েটারের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা প্রাতিষ্ঠাানিকভাবে শিক্ষিত তরুণ নাট্যকর্মীশ্রেণির শক্তি, যারা দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে আগামীর থিয়েটারকে নেতৃত্ব দিতে পারবে।
থিয়েটার নিয়ে ভবিষ্যত্ ভাবনাটা কী?
ঐতিহ্যের ধারায় বাঙালির আধুনিক নাট্য ‘বাংলা নাট্যরীতি’ বিনির্মাণে সর্বোচ্চ নিবেদিত হতে চাই। বাংলা নাট্যরীতিকে বিশ্বনাট্য-আসরে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে চাই।
সবশেষে সেলিম আল দীনের শিষ্য হিসেবে তার মূল্যায়ন করুন?
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের শিল্পচেতনাশৃঙ্গের সমুন্নতি আমার অনুক্ষণের বিস্ময়!