জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দুটি ফর্মুলা দিয়েছে হাইকোর্ট। প্রথম ফর্মুলায় বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী। নতুন ৫০ জন মন্ত্রী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ওই সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা দলগুলো থেকে ভোটের হারের অনুপাতে মন্ত্রী নেয়া হবে। হাইকোর্টের দ্বিতীয় ফর্মুলায় রাষ্ট্রক্ষমতা ভাগাভাগির তত্ত্ব দেয়া হয়েছে। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রথম চার বছর ক্ষমতায় থাকবে। আর সংসদের প্রধান বিরোধী দল সর্বশেষ এক বছর ক্ষমতায় থাকবে। তবে এর পেছনে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। আদালত বলেছে, প্রথম ফর্মুলার জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে না। তবে দ্বিতীয় ফর্মুলার জন্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। হাইকোর্ট মনে করে, ফর্মুলাগুলো হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চিত আক্রমণাত্মক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার উপায়।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১৯ ধারার বৈধতা প্রশ্নে জারিকৃত রুল খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই অভিমত দিয়েছে হাইকোর্ট। সম্প্রতি এ রায় প্রকাশ পেয়েছে। তবে এ রায়ের সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’এর পরিচালক ড. শাহদীন মালিক। তিনি গতকাল রাতে ইত্তেফাককে বলেন, ১৫৩ সংসদ সদস্যের (এমপি) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়াকে বৈধ বলেছে হাইকোর্ট। কিন্তু হাইকোর্টের রিট জুরিসডিকশনে এখতিয়ার হলো কোন কার্যক্রম বা পদ্ধতি আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ না অবৈধ তার বিচার করা। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার কতজনের হবে তা সম্পূর্ণরুপে নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার। এসব ব্যাপারে হাইকোর্টের মন্তব্য করা কাম্য নয়। ড. শাহদীন মালিক বলেন, রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় করবেন। এটা আদালতের বিবেচ্য বিষয় নয়। এসব ব্যাপারে আদালত মন্তব্য করে অহেতুক জটিলতা ও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। তবে রিটকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম বলেন, এসব ফর্মুলার মূল কথা হচ্ছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। তার জন্য জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করা রাজনৈতিক দলগুলোকেই করতে হবে। তবে সবার আগে সরকারি দলকেই এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, প্রথম ফর্মুলা বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে দ্বিতীয় ফর্মুলা অন্য কোন দেশে আছে কিনা জানা নেই।
বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের ডিভিশন বেঞ্চ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১৯ ধারার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল গত বছরের ১৯ জুন খারিজ করে দেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জাতীয় পার্টি নেতা খোন্দকার আবদুস সালাম হাইকোর্টে এই রিট আবেদন দায়ের করেন। রিট খারিজের পূর্ণাঙ্গ এই রায় প্রকাশ পেয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধান অবৈধ নয়। নির্বাচনে কোন প্রার্থী না থাকলে একক প্রার্থীর বিজয়ী ঘোষণা করা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। এ কারণেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৪ সংসদ সদস্যের (এমপি) বিনা প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতায় নির্বাচিত হওয়া নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
প্রকাশিত রায়ে হাইকোর্ট একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা নিরসনে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এক পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হবার পর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে অসীম বিরোধ সমাধানে কোনো ফর্মুলাই জাতির উপকারে আসবে না যতদিন না/যদি না রাজনৈতিক দলগুলো সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা গড়ে তুলতে আন্তরিক ও ঐকান্তিক হয়।
ফর্মুলা ১: হাইকোর্টের দেয়া প্রথম ফর্মুলা মোতাবেক, ৫০ জন নতুন মন্ত্রী নিয়ে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একাদশ সংসদ নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে অথবা সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পরে এ মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলের এমপিরা মন্ত্রী হবেন। রাজনৈতিক দলের মন্ত্রী থাকার অনুপাত নির্ধারণ করা হবে দশম জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো কত শতাংশ ভোট পেয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। তবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে ৫ জন টেকনোক্রেট মন্ত্রী দশম সংসদ নির্বাচন বয়কটকারী দলগুলো থেকে নেয়া যেতে পারে। হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, যেমন: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জন-প্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ, আইন, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বণ্টন নিয়েও কথা বলেছে। বিতর্ক এড়াতে লটারির মাধ্যমে এ মন্ত্রণালয়গুলো বণ্টনের প্রস্তাব দিয়েছে হাইকোর্ট। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দ্বাদশ এবং এরপরের নির্বাচনগুলোও এ ফর্মুলায় হতে পারে বলে অভিমত দিয়েছে হাইকোর্ট।
দ্বিতীয় ফর্মুলা: দ্বিতীয় ফর্মুলায় মূলত উঠে এসেছে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে। এ ফর্মুলা মোতাবেক, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রথম চার বছর দেশ শাসন করবে। এর পরের এক বছরের জন্য দেশের ক্ষমতা যাবে প্রধান বিরোধী দলের হাতে। তবে প্রধান বিরোধী দলকে দেশ পরিচালনার ভার দেয়া যাবে শুধুমাত্র যদি দলটি সর্বশেষ নির্বাচনে বিজয়ী দলের চেয়ে কমপক্ষে অর্ধেক ভোট পেয়ে থাকে। এরপর প্রথম ফর্মুলা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার নেতৃত্বে গঠিত হবে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা। আর যদি প্রধান বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলের অর্ধেক ভোটও না পেয়ে থাকে, তবে ৫ বছরই দেশ চালাবে ক্ষমতাসীন দল। দুটি ফর্মুলা ছাড়াও হাইকোর্ট আরও কিছু প্রস্তাব রেখেছে। রায়ে হাইকোর্ট বলেছে, একটি মুক্ত, ন্যায্য ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজন রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব। হোক সেটা সংসদের ৫ বছরের মেয়াদ পূরণ হবার আগে বা পরে। অনেক সাংবিধানিক কার্যাবলীর মধ্যে, যেমনটি আমাদের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে লেখা আছে, জাতীয় নির্বাচন ব্যতিত কেউই গণতন্ত্র বা আইনের শাসন পরিচালনা ধারণ করতে পারে না। তাই, দেশের সব রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, নির্বাচনের পূর্বে একটি নির্বাচন বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা ও নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখা এবং একইভাবে নির্বাচন কমিশনকে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া। এ জন্য সকল রাজনৈতিক দলকে রাস্তায় আন্দোলন বা সহিংস রাজনৈতিক পন্থা অবলম্বন থেকে বিরত থাকতে হবে।