কোথায় যাবে শিশু একাডেমি! প্রায় চার হাজার শিশু শিক্ষার্থী সপ্তাহের তিন দিন সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, গিটার, তবলা, ইংরেজি ভাষা, দাবা, কম্পিউটার ও সুন্দর হাতের লেখা চর্চা করে মুখরিত করে রাখে এই একাডেমি প্রাঙ্গণ। সবুজে ঘেরা বিশাল এক মাঠসহ তাদের আছে ৪০ হাজার বই সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে শিশু একাডেমির প্রায় চার একর পরিমাণ সম্পত্তি সুপ্রিম কোর্টের মর্মে রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। এই রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ।
গত ৪ আগস্ট হাইকোর্ট শিশু একাডেমি কর্তৃপক্ষের কাছে সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি হস্তান্তরের কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা জানতে চায়। শিশু একাডেমি আদলতকে জানায়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজধানী ঢাকার কোথাও তাদের এত বড় জায়গা দিতে পারবে না বলে জানিয়েছে। পরে শিশু একাডেমি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অবকাঠমো হস্তান্তরের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চায়। তবে এই বিশাল অংকের অর্থ বরাদ্দের জন্য সরকারের উঁচু মহলের অনুমতির প্রয়োজন বলে জানায় অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও এখনই শিশু একাডেমি সরিয়ে নেয়া সম্ভব নয় বলে জানান কর্তৃপক্ষ। এর আগেও হাইকোর্ট তরফে শিশু একাডেমিকে সুপ্রিম কোর্টের জায়গা ছেড়ে দেয়ার জন্য কয়েকদফা তাগিদ দেয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে শিশু একাডেমির ভবিষ্যত্ নিয়ে অনেকেই শংকিত হয়ে পড়েছেন।
লিভ টু আপিল খারিজ
২০১১ সালের ২৮ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি রক্ষায় হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী রাজধানীর সড়ক ভবন ও শিশু একাডেমির সম্পত্তিসহ ৫৫ দশমিক ৫ একর সম্পত্তি সুপ্রিম কোর্টের বলে গণ্য হবে। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৭ বিচারপতির বেঞ্চ ২৮ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দেন। সড়ক ভবন ও শিশু একাডেমির পক্ষে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এই লিভ টু আপিল করা হয়েছিল। ২০১১ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ জনস্বার্থে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি সংক্রান্ত এক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সি এস খতিয়ান ১৬ হাজার ৮৫৫ এবং ১৬/১৬২ মৌজার মোট ৫৫ দশমিক ৫ একর সম্পত্তি সুপ্রিম কোর্টের বলা হয় (যার মধ্যে ১১ বিঘা বা ৩ দশমিক ৬৯ একর জায়গায় শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠিত)। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোটের সম্পত্তি রক্ষায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়া হয়। ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী আসাদুজ্জামান সিদ্দিক ও এখলাস উদ্দিন ভুঁইয়া পাক-ভারত উপমহাদেশের ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সীমানা নির্ধারণের জন্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল খারিজ হওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন সড়ক ভবন ও শিশু একাডেমি সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়। হাইকোর্ট ভারত ও পাকিস্তানের তত্কালীন ভূমি রেকর্ড ও কোর্টের রেজিস্ট্রারের দেয়া তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে রায় ঘোষণা করেন। এখন সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি রক্ষা করতে হবে।
কোথায় যাবে শিশু একাডেমি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিশু একাডেমির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, পূর্তমন্ত্রণালয়ের কাছে বেশ কয়েক দফা শিশু একাডেমি স্থানান্তরের বিষয় জায়গা চেয়ে আসছেন তারা। কিন্তু পূর্তমন্ত্রণালয় তাদের চাহিদা মোতাবেক জায়গা নাই বলে জানিয়ে দেয়। তিনি বলেন, শিশু একাডেমি সড়ক ভবনের মতো নয় যে অতি সহজেই শিশুদের নিয়ে শিশু একাডেমির অবকাঠামো সরিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। এই বিষয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক সচিব নাসিমা বেগম এনডিসিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সঙ্গে কয়েকদফা চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সাবেক মহিলা ও শিশু বিষয়ক সচিব তারক-উল ইসলাম ইত্তেফাক বলেন, আদলতের রায় শিশু একাডেমিকে মানতে হবে।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি
১৯৭৬ সালে প্রায় ১১ বিঘা বা ৩ দশমিক ৬৯ একর জায়গায় শিশুদের শিল্পকলার নানা বিষয় প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মধ্যকার সুকুমার বৃত্তি চর্চার নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। ১৯৮০-৮১ সালে একই কারণে ২০ জেলা শহরে শুরু হয় শিশু একাডেমির কার্যক্রম। ১৯৯৩-৯৫ সালের মধ্যে শিশু একাডেমি সম্প্রসারিত হয় ৪৪টি জেলায়। ১৯৯৬-৯৭ সালে ৬ বিভাগ ও ৬ থানায় শিশু একাডেমির কার্যক্রম প্রসার লাভ করে। কেন্দ্রীয় শিশু একাডেমিতে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি বই নিয়ে বিশাল এক লাইব্রেরি আছে। এই লাইব্রেরির দায়িত্বে নিয়োজিত রেজিনা আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, ৯০০ এর অধিক তাদের সদস্য। শিশু গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা নিয়মিত এই লাইব্রেরিতে আসেন। এছাড়াও শিশু একাডেমির আছে নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা। শিশুদের জন্য ‘শিশু’ পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। এখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক দর্শনীয় যাদুঘর। যাদুঘরে প্রাচীন আমল থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত রূপরেখার উপর চিত্রপট স্থান পেয়েছে। এছাড়াও ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে নিহত প্রথম কিশোর মতিউরের নামে ও ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে নিহত শিশু শেখ রাসেলের নামে দুইটি মুক্ত মঞ্চ আছে। শিক্ষার্থী আর অভিভাবকগণ এই স্থান থেকে শিশু একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানকে সরিয়ে নেয়ার ঘোর বিরোধী। তারা প্রায়ই শিশু একাডেমি সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন।