ইন্টেল-মাইক্রনের যুগান্তকারী উদ্ভাবন

স্টোরেজ ডিভাইস থেকে শুরু করে র্যাম, রম কিংবা প্রসেসরের ক্যাশেও ছড়িয়ে আছে মেমোরির ব্যবহার। একটা সময় পর্যন্ত মেমোরি নির্ভরশীল ছিল ম্যাগনেটিক ডিস্কের ওপর। সেই ধারায় প্রথমবারের মতো নন-ভোলাটাইল মেমোরি হিসেবে ১৯৮৯ সালে আবির্ভাব ঘটে ন্যান্ড (NAND) ফ্ল্যাশ মেমোরির। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির আপডেটই একে উন্নত থেকে উন্নততর করে তুলছে। দীর্ঘ ২৫ বছর পর এবারে ইন্টেল ও মাইক্রনের যৌথ গবেষণায় উদ্ভাবন হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের নন-ভোলাটাইল মেমোরি প্রযুক্তি থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরির। জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব

 
যেকোনো ধরনের কম্পিউটারের জন্যই একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো মেমোরি। প্রসেসরের ক্যাশ মেমোরি, র্যানডম অ্যাকসেস মেমোরি (র্যাম), রিড অনলি মেমোরি (রম)—এগুলো সবই মেমোরিরই রকমফের। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের স্টোরেজও মূলত মেমোরিই। একটা সময় পর্যন্ত ম্যাগনেটিক ডিস্ককে নির্ভর করে তৈরি হতো মেমোরি ডিভাইস। গতির দিক থেকে তা ছিল অত্যন্ত ধীর। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণায় ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির আবির্ভাব মেমোরিতে যোগ করে দারুণ গতি। আজকের দিনে বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহূত ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ (পেনড্রাইভ নামে পরিচিত) থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সলিড স্টেট ড্রাইভ (এসএসডি)—এগুলোর সবই নন-ভোলাটাইল ধরনের ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেই তৈরি।
 
মেমোরি প্রযুক্তিতে নতুন প্রজন্ম
 
১৯৮৯ সালে ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির আবির্ভাবের পর থেকে আর মেমোরিতে নতুন কোনো প্রযুক্তির আগমন ঘটেনি। ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির বিভিন্ন ধরনের আপডেটের কারণে এর গতিও বেড়েছে। ন্যান্ড ফ্ল্যাশ যেমন মেমোরির জগতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল, তেমন কোনো পরিবর্তন আর মেমোরির জগতে হয়নি গত ২৫ বছরে। তাই বলে এই সময়ে কিন্তু মেমোরি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা থেমে থাকেনি। বড় বড় সব প্রযুক্তি কোম্পানিই মেমোরি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গেছে এই সময়ে। আর শেষ পর্যন্ত তাতে সাফল্য পেলো ইন্টেল ও মাইক্রন। মার্কিন শীর্ষ এই দুই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা এমন এক ধরনের নন-ভোলাটাইল মেমোরি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সমর্থ হয়েছে যাতে গতি পাওয়া যাবে ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির এক হাজার গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, এই মেমোরির স্থায়িত্বও হবে ন্যান্ড ফ্ল্যাশের চাইতে এক হাজার গুণ বেশি। থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট (XPoint বানানে লেখা) নামের এই মেমোরি প্রযুক্তি তাই প্রযুক্তিবিশ্বে নতুন এক যুগের সূচনা করার সম্ভাবনা রাখে বলে জানাচ্ছে ইন্টেল ও মাইক্রন।
 
বিগ ডাটার সহায়
 
সময়ের সাথে সাথে কম্পিউটারের ব্যবহার বেড়েছে নানাভাবে। ইন্টারনেটের আবির্ভাবের পর ডাটার পরিমাণও বেড়েছে বহুগুণে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারনেট অব থিংসের কল্যাণে কানেক্টেড ডিভাইসের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়তে শুরু করায় এই ডাটার পরিমাণ বাড়ছে লাগামহীনভাবে। তাছাড়া মাল্টিমিডিয়ার উন্নয়নের সাথে সাথে গ্রাফিক্যাল বিভিন্ন ডাটার আকারও বাড়ছে। আধুনা ফোরকে রেজ্যুলেশনের আগমনে এখন ভিডিও ফাইল বা গেমগুলোর আকার আগের হাই-ডেফিনেশন রেজ্যুলেশনের ফাইলের চাইতে চারগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এতসব ডাটাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে গেলে এগুলোকে যেমন সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজন বাড়তি স্টোরেজ, তেমনি এগুলোকে চালানো এবং বিশ্লেষণ করার প্রক্রিয়াও হতে হবে দ্রুত। কিন্তু মেমোরির ক্ষেত্রে সাধারণ একটি ধর্ম হলো এর আকার যত বড় হবে, এর গতি তত কমবে। আবার বাড়তি আকারের মেমোরির জন্য প্রয়োজন বাড়তি পাওয়ার এবং এর খরচও তাতে বেড়ে যায়। ফলে ব্যাপক পরিমাণ ডাটার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে ডিভাইস নির্মাতাদের স্টোরেজ ও মেমোরি ডিভাইস তৈরি, এর পারফর্ম্যান্স বজায় রাখা এবং এর উত্পাদন খরচের সমন্বয় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণে প্রযুক্তি কোম্পানিদের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরি প্রযুক্তি। এগুলোতে এখনকার সর্বোচ্চ গতিশীল ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির চাইতে যেমন এক হাজার গুণ বেশি গতি পাওয়া যাবে, তেমনি এগুলোর স্থায়িত্বও হবে এখনকার ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির চাইতে এক হাজার গুণ বেশি। তাছাড়া প্রচলিত এসব মেমোরির চাইতে থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট প্রযুক্তির মেমোরির মেমোরি ঘনত্বও হবে ১০ গুণ বেশি। ফলে বিদ্যমান কোনো ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির একই আকারের মধ্যে ১০ গুণ বেশি মেমোরি সংযুক্ত করা যাবে থ্রিডি ক্রসপয়েন্টে; এর গতি আর স্থায়িত্বের কথা তো বলাই হয়েছে।
 
যেভাবে কাজ করে থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরি
 
থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরি প্রযুক্তির নামটি নেওয়া হয়েছে এর গাঠনিক প্রক্রিয়া থেকে। এই মেমোরিতে ব্যবহার করা হয়েছে থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক কাঠামো। বেশকিছু তারের কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত এই মেমোরি। এর কাঠামোর প্রতিটি স্তরে তারগুলো পরস্পরের সাথে সমান্তরালে অবস্থান করে। কিন্তু সেই স্তরটি আবার এর নিচের আরেকটি স্তরের সাথে অবস্থান করে সমকোণে। এই স্তরগুলোর মাঝখানে আবার রয়েছে সাব-মাইক্রোস্কোপিক কলাম যা আগের দুই স্তরের তারগুলোর সংযোগস্থলগুলোকে সংযুক্ত করে রাখে। এই কলামগুলোতে থাকে ‘মেমোরি সেল’ যা একক বিট ডাটা সংরক্ষণ করতে পারে। বাইনারিতে এই ডাটা ‘০’ বা ‘১’ হতে পারে। কলামগুলোতে একটি করে ‘সিলেক্টর’ যা কোনো সুনির্দিষ্ট মেমোরি সেলের তথ্য পড়তে পারে বা ওই সেলে তথ্য লিখতে পারে। কাঠামোর তারগুলোর ভোল্টেজের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এই সিলেক্টর সুনির্দিষ্ট মেমোরি সেলে কাজ করতে পারে। এর ত্রিমাত্রিক কাঠামোর কারণে ডাটা রিড ও রাইটে গতি পাওয়া যায় এখনকার মেমোরির তুলনায় দ্রুত। ইন্টেল ও মাইক্রন জানিয়েছে, দুই স্তরের একটি মেমোরি ডাইয়ে ১২৮ বিলিয়ন মেমোরি সেল অবস্থান করে। তাতে করে একটি ডাইয়েই ১২৮ গিগাবিট স্টোরেজ তৈরি হয়। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গেলে মেমোরির স্তর বাড়ানো সম্ভব এবং তাতে করে প্রতিটি ডাইয়ে আরও বেশি স্টোরেজ যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে ইন্টেল ও মাইক্রন।
 
বাজারে আসবে সামনের বছর
 
ইন্টেল ও মাইক্রনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিক থেকেই থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কিছু ডিভাইস পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা হবে। সুনির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির জন্য মূলত তৈরি করা হবে এসব ডিভাইস। এ ছাড়া ইন্টেল ও মাইক্রন পৃথকভাবে এই প্রযুক্তির কিছু কিছু পণ্য তৈরি করতে থাকবে। প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এই প্রযুক্তির খরচ এখনও পর্যন্ত প্রচলিত স্টোরেজ বা মেমোরির তুলনায় বেশি থাকায় এখনই এর বহুল ব্যবহারও সম্ভব হবে না। তাই বর্তমান স্টোরেজ ও মেমোরি ডিভাইসের পাশাপাশিই থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরির ব্যবহার চলতে থাকবে। সেক্ষেত্রে কম্পিউটারের মূল গাঠনিক কাঠামোতে এর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লক্ষ করা যেতে পারে। কম্পিউটার পরিচালনার জন্য যেসব তথ্য জরুরি সেগুলো যেন থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরিতে অবস্থান করে, সেটি নিশ্চিত করা গেলে কম্পিউটার পরিচালনার গতি অনেকটাই বেড়ে যাবে। আবার ফোরকে রেজ্যুলেশন পেরিয়ে এইটকে রেজ্যুলেশনের গেম নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারাও থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরি ব্যবহারে আগ্রহী হবেন বলে ধারণা করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। বছর পাঁচেক পর থ্রিডি ক্রসপয়েন্ট মেমোরি সাধারণ মানুষের হাতে চলে আসতে পারে বলে মনে করছেন তারা।