হঠাত্ করেই হাসপাতালে শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো। দেখা গেলো, সব শিশু একই উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। হাসপাতালে আসা সকল শিশুর প্রস্রাব বন্ধ, কিডনি বিকল, খিচুনি, ঘন ঘন বমি, হাতে পায়ে পানি জমে ফুলে যেতে দেখা যায়। টনক নড়ে ঢাকা শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এটা ১৯৯২ সালের কথা।
সে সময় ওই হাসপাতালের অধ্যাপক ডা: এমএ হানিফ ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা শুরু করেন। তিনি শিশুদের খাওয়ানো প্যারাসিটামল সিরাপের অবশিষ্ট থাকা বোতল পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর আকাশ থেকে পড়েন তিনি।
পরীক্ষায় দেখা যায়, এই সিরাপে ‘ডাই ইথিলিন গ্লাইকল’ নামক এক ধরনের বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। এই বিষ মূলত ওষুধ জমে যাওয়া এবং পিপড়া কিংবা পোকার আক্রমণ থেকে ওষুধ রক্ষা করতে ব্যবহার করা হয়।
তখন এটি নিয়ে সারাদেশে হইচই পড়ে যায়। আলোচিত এই ঘটনার পর ৫টি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্কালীন সুপার এবং বর্তমান পরিচালক আবুল খায়ের চৌধুরী। ১৯৯২ সালের ১৮ নভেম্বর দুটি ধারায় বিসিআই বাংলাদেশসহ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। অন্য চার প্রতিষ্ঠান হলো- রেক্স, ফলিক্যাম, এডফ্লেম এবং রিড।
১৯৯৪ সালের ২ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হলেও অভিযুক্ত পাঁচ কোম্পানির আবেদনে উচ্চ আদালত মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেন। দীর্ঘ ১৮ বছর মামলার কোনো কার্যক্রম ছিল না। অবশেষে ২০১১ সালে সেই স্থগিতাদেশ ওঠার পর গত বছর ৭ আগস্ট মামলার শুনানি শুরু হয়।
১৯৮৯ সাল থেকে ৯২ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন শতাধিক শিশু মারা যাওয়ার পর মামলাটি করা হয়। এই শিশুরা ঢাকা শিশু হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে এসেছিল। এর বাইরে সারাদেশে কত শিশু মারা গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে শিশু হাসপাতালের চিকিত্সকরা ধারণা করছেন, সারাদেশে বিষাক্ত ওষুধ খেয়ে কয়েক হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
২০০৯ সালে নিষিদ্ধ পাঁচ কোম্পানির একটির ওষুধ খেয়েও বেশ কিছু সংখ্যক শিশু মারা যায়। ২৩ বছর পরে এসে আলোচিত সেই মামলার রায় দিল ড্রাগ আদালত। যদিও রায়ের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। তারা দ্রুত ড্রাগ আইন সংশোধন করার দাবি জানিয়েছে।
জানা যায়, ড্রাগ আইনে ভেজাল ওষুধ তৈরির সর্বোচ্চ শাস্তি দশ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানা। তবে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এটা মেনে নেয়া যায় না।
দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া দরকার ছিল। তিনি আরও জানান, এসব ঘটনায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ড্রাগ আইনে মামলা করে। এর বাইরে মামলা করতে পারে না অধিদপ্তর। তবে পুলিশ ৩০২ ধারায় মামলা করলে অনেক ভালো হতো। ন্যায় বিচার পেতো শিশুদের অভিভাবকরা।
শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মঞ্জুর হোসেন বলেন, ভেজাল ওষুধ খেয়ে এত শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত ছিল। ২৩ বছর পর দেয়া রায়ে উক্ত কোম্পানিগুলোকে একপ্রকার খালাস দেয়া হল।