জাতীয় পরিচয়পত্র ঘিরে গড়ে উঠেছে দালালচক্র

জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী দালালচক্র। অর্থের বিনিময়ে এনআইডি সংশোধন, হারানো কার্ড উত্তোলন ও স্থানান্তরের কার্যক্রম করছে চক্রটি। আগারগাঁওয়ের ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনে অবস্থিত জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) বেশ ক’জন অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে অশুভ সিন্ডিকেটের। দেশের বিভিন্নস্থানে জেলা-উপজেলা কর্মকর্তারাও এর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।

 
দালালচক্র প্রবাসী অথবা বিদেশগামী ‘পার্টি’র খোঁজ পেলেই নানা অজুহাতে হয়রানি করছে। মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে গোপনে ইসির সার্ভার থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের যে কোন ধরনের সেবা দিচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের ৫ জন দালালকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। এনআইডির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহউদ্দিন ‘ইত্তেফাক’কে বলেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র বাণিজ্যের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হবে। যারা দালালদের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা নিয়েছে তাদের পরিচয়পত্র পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া হবে।
 
সরেজমিন দেখা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। শিকার হতে হচ্ছে হয়রানির। এতে সুযোগ নিচ্ছে দালালরা। এনআইডির নিচতলায় বিনামূল্যের ফরম বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। লিখে দিলেও লাগছে ৩০ টাকা। আর একদিনের মধ্যে কার্ড পেতে লাগছে দেড় হাজার টাকা। কার্ড হারানোর জিডি না থাকলে অতিরিক্ত ৩শ টাকা। এছাড়া কাগজপত্রে অসঙ্গতি থাকলে দালালরা নিচ্ছে ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ভবনের নিচে রাস্তার পাশে ফুটপাতে চেয়ার টেবিল নিয়ে এসব করছেন দালালরা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী যোগসাজশে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার নামে চলছে রমারমা বাণিজ্য। এনআইডির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা আটঘাট বেঁধে দালালচক্রকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্যাকেট ভরে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তিনি। এনআইডির সামনেই ‘দোকান’ খুলে চলছে বাণিজ্য। মহাখালীতেও রয়েছে দালালদের ‘দোকান’। এভাবে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে দালালদের দোকান থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কাস্টমার সংগ্রহ করা হচ্ছে। দালালদের টাকা ঠিকমতো পৌঁছে যাচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র অনু বিভাগের অপারেশন, টেকনিক্যাল ও যাচাই বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি অফিসে দালালদের উত্পাত থাকলেও এই অফিসের চিত্র ছিল ভিন্ন। মাত্র কিছুদিন আগেও দালালদের প্রভাবমুক্ত ছিল জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগ। কিন্তু এখন দালালরা আখড়া পেতেছে এই অফিসেরই কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে।
 
ইসির কর্মকর্তারা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, এনআইডির অর্গানোগ্রামে ৭১টি পদ থাকলেও ইসির নিজস্ব কর্মকর্তা রয়েছে মাত্র ১৯ জন। এনআইডিকে সহায়তার জন্য ইসির আইডিইএ (আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিসেস) প্রকল্পের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রকল্প কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দু’হাতে পয়সা কামাচ্ছেন। তাদের নেই কোন জবাবদিহিতা। প্রকল্পের মেয়াদ আছে আর মাত্র পৌনে দু’বছর। এসময়ে তারা হরিলুটে মত্ত। আর ওই প্রকল্পের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত রয়েছে ইসির নিজস্ব ১৯ কর্মকর্তার এক শীর্ষ ব্যক্তির।
 
২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের সাথেই দেয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্র ভোটারের চিহ্ন বহন করলেও এখন জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার হচ্ছে জাতীয় জীবনের নানা প্রয়োজনে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পাসপোর্ট, মোবাইল সিম ক্রয়, ব্যাংক একাউন্ট খোলা, ব্যবসায়িক নিবন্ধনসহ গুরুত্বপূর্ণ সব কাজে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র। এনআইডির ভোটার তালিকা হালনাগাদে প্রতিবারই তথ্য সংগ্রহের সময় উভয়পক্ষের গাফিলতির কারণে তথ্যের গরমিল থাকছে। এসব ক্ষেত্রে নামের বানান, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, পিতা-মাতার নামের বানান নির্ভুল করা যায়নি। মাঠ পর্যায়ের অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করে ভোটার তথ্য সংগ্রহ ফরমে পিতা-মাতার নাম ও বর্তমান ঠিকানা ভুল করা এবং আইডি নম্বরের ঘর খালি রাখা, শনাক্তকারীর স্বাক্ষর না থাকা, সুপারভাইজার ও যাচাইকারীর নাম ও স্বাক্ষর না থাকা, এইচএসসি পাস হওয়া সত্ত্বেও স্বাক্ষর না নিয়ে শুধু টিপসই নেয়া, আঙ্গুলের অস্পষ্ট ছাপ, ইংরেজি ও বাংলা বানানে অসামঞ্জস্য প্রভৃতি ২১টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। দায়ী মাঠকর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে কারো বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।