শামসুর রাহমান

কবিতা যাঁর মুক্তিসংগ্রাম

 
‘আমি মনে করি, এই উপমহাদেশের কিছু সংখ্যক গোঁড়া, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদের একগুঁয়েমির দরুণ, ষড়যন্ত্রের ফলে এক নিদারুণ ট্রাজেডির শিকার হতে হয়েছে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে, যার জের যুগ যুগ ধরে চলবে, যদি না বিরাট কোনো পরিবর্তনের সূচনা হয়...।’ হিন্দু-মুসলমান দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সাতচল্লিশ সালে সংগঠিত দেশভাগ সম্পর্কে আত্মজীবনীতে এভাবেই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন কবি শামসুর রাহমান।
 
বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামে শামসুর রাহমানের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় তার অসাধারণ সব সাহিত্য প্রচেষ্টায়। কবি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন তখন থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তুমুল আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির কয়েক দিন আগে প্রচণ্ড শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে তিনি ভাষা আন্দোলন নিয়ে ‘আর যেন না দেখি’ শিরোনামে একটি কবিতা রচনা করেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত কবিতা সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’-তে কবিতাটি স্থান পায়। কবিতাটিকে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে স্থান দেওয়ার পেছনে হাসান হাফিজুর রহমানের যুক্তি ছিল, এই কবিতায় পরবর্তী একুশে ফেব্রুয়ারির মর্মান্তিক অথচ বীরোচিত ঘটনার পূর্বাভাস বিদ্যমান।
 
১৯৫৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯৫৬ সালে একদিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয় অন্যদিকে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করা হয় পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৫৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হয়। সাংবাদিক হিসেবে সামরিক সরকারের প্রকাশ্য বিরুদ্ধ না হলেও কবি হিসেবে সেই সামরিক আইনের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে তিনি ঠিকই কলম চালিয়েছেন বুদ্ধিমত্তার সাথে। ‘হাতির শুঁড়’ কবিতাটি মহাপ্রতাপশালী স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লেখা তেমনি এক কালজয়ী কবিতা। ‘ঘুমের খাটে শঙ্খমালা ঘুমন্ত;/ কৌটো-খোলা ভোমরা মরে জীবন্ত।/ ঐরাবতের খেয়ালখুশির ধান্ধায়/ ভোরের ফকির মুকুট পরে সন্ধ্যায়।/...সেই চালে ভাই মিত্র কি-বা শত্তুর/ চলছে সবাই- মস্ত সহায় হাতির শুঁড়।’ কবিতাটি সে সময় সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
 
১৯৬০ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালের মে মাসে ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়, উক্ত অনুষ্ঠানে কবি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে রচিত নিজের কবিতা ‘সূর্যাবর্ত’ পাঠ করেন। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ পুরস্কৃত না হলেও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’ ১৯৬৩ সালে আদমজী পুরস্কারে ভূষিত হয়।
 
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বাঙালির ‘মুক্তির সনদ’ ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি ঘোষণা করেন। ছয়দফা ঘোষণার পর শেখ মুজিবুর সামরিক জান্তা কর্তৃক আবারও কারারুদ্ধ হন। সে সময় শামসুর রাহমান কারারুদ্ধ মুজিবকে নিয়ে গ্রিক পুরাণের আড়ালে লিখেন ‘টেলেকেমাস’ নামক কবিতা, যার সূচনা হয়েছে এভাবেই, ‘তুমি কি এখনও আসবে না? স্বদেশের পূর্ণিমায়/ কখনও তোমার মুখ হবে না কি উদ্ভসিত, পিতা,/ পুনর্বার? কেন আজও শুনি না তোমার পদধ্বনি?’ ১৯৬৭ সালের ২২ জুন রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করা হয়। তখন মুনীর চৌধুরী রচিত এক প্রতিবাদী বিবৃতিতে অন্যান্যের সঙ্গে শামসুর রাহমানও স্বাক্ষর প্রদান করে এর প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন।
 
১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে আবার কারাফটক থেকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়। আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রোমান অক্ষরে বাংলা লেখা প্রচলন করার অপপ্রয়াস চালায়। আটষট্টি সালে সুযোগ বুঝে কিছু লোক আবারও বাংলা অক্ষর রদবদলের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। সে সময় কবি ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতাটি রচনা করেন, ‘হে আমার আঁখিতারা তুমি উম্মীলিত সর্বক্ষণ জাগরণে।/ তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার ?/ উনিশ শো বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলী/ বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।’
 
১৯৬৯ সালে স্বৈরশাসক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গণতন্ত্রকামী মুক্তিমুখী জনতার গণঅভ্যূত্থানে পরিণত হয়। সে বছর ২০ জানুয়ারি ছিল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। পুলিশের গুলিতে শহীদ হয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আসাদ। কবি লিখলেন, ‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা/ সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক;/ আসাদের শার্ট আমাদের প্রাণের পতাকা।’ কবিতার নাম ‘আসাদের শার্ট’। কবির ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থের ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, ‘হরতাল’, ‘এ শহর’, ‘মা’, ‘দুঃস্বপ্নে একদিন’ কবিতাসকল সেই গণঅভ্যূত্থানের আখ্যান বহন করছে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপধিতে বিভূষিত করে। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আইয়ুব খানের জায়গায় জেনারেল ইয়াহিয়া খান অধিষ্ঠিত হয়। ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের নাম বাংলাদেশ ঘোষণা করেন। 
 
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের বাংলাদেশে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘গর্কি’। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়, অসহায় হয়ে পড়ে কোটি মানুষ, অথচ শাসকগোষ্ঠী নির্বিকার। সে সময় তিনি ‘সফেদ পাঞ্জাবী’, ‘আসুন আমরা আজ’, ‘একজন জেলে’র মতো কালজয়ী কবিতা রচনা করেন। ‘আসুন আমরা আজ’ কবিতার কয়েকটি পঙিক্ত—‘চাদ্দিকে সতেজ ঘ্রাণ কাফনের; অনেক জায়গায়/ দাফনের জন্য কোনও লোক নেই। আমার পকেটে/ দু’টি মৃত গ্রাম্য শিশু, গলায় ঝুলছে যুব-লাশ,/ আঙুলে জড়ানো লজ্জাবতী বধূর বিবস্ত্র চুল।/ আমার হূদয় হয় অগোচরে রুক্ষ মরুভূমি,/ যোজন যোজনব্যাপী অতিশয় উদার শ্মশান !’
 
২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি বাহিনী  বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যা। ২৫ মার্চ কালো রাতের বর্ণনা পাওয়া যায় শামসুর রাহমানের ‘তুমি বলেছিলে’ কবিতায়—‘দাউদাউ পুড়ে যাচ্ছে ঐ নয়াবাজার,/ আমাদের চৌদিকে আগুন,/ গুলির ইস্পাতী শিলাবৃষ্টি অবিরাম।/ তুমি বলেছিলে,/ ‘আমাকে বাঁচাও।’/ অসহায় আমি তা-ও বলতে পারি নি।’ ২৭ মার্চ কবি তাঁর আশেক লেনের বাসা পরিত্যাগ করেন। ২৮ মার্চ নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে পরিবারসহ পাড়ি জমান। প্রায় দেড়মাস পাড়াতলী গ্রামে অবরুদ্ধ ছিলেন। এপ্রিল মাসের সাত অথবা আট তারিখ গ্রামের বাড়ির পুকুরঘাটে বসে লিখেন স্বাধীনতা যুদ্ধের দুই অমোঘ কবিতা—‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’। কবিতাগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘মজলুম আদিব’ আড়াল নামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়।
 
একাত্তরের বাকিটা সময় কবিকে ঢাকা শহরে পরিবার নিয়ে সীমাহীন উত্কণ্ঠাতে জীবন যাপন করতে হয়েছে। কবির তখনকার অনেক কবিতার একটি কবিতা এমন—‘কখনও নিঝুম পথে হঠাত্ লুটিয়ে পড়ে কেউ গুলির আঘাতে,/ মনে হয়, ওরা গুলিবিদ্ধ করে স্বাধীনতাটাকেই।/ দিন দুপুরেই জিপে একজন তরুণকে কানামাছি করে/ নিয়ে যায় ওরা;/ মনে হয় চোখ-বাঁধা স্বাধীনতা যাচ্ছে বধ্যভূমিতে।/ বেয়নটবিদ্ধ লাশ বুড়িগঙ্গায় কি শীতলক্ষ্যায় ভাসে;/ মনে হয় স্বাধীনতা লখিন্দর যেন,/ বেহুলাবিহীন...’ একাত্তরে ঢাকা শহরের মতো মৃত্যুকূপে অবস্থান করে কবিতা লেখা এবং তা সংরক্ষণ করে যথালক্ষ্যে পৌঁছানো ছিল মহা সংগ্রামের কাজ। কলম হাতে আরেক মুক্তিযুদ্ধ।
 
এ সম্পর্কে আত্মজীবনীতে কবি লিখেছেন, ‘জানতাম, এতে ঝুঁকি আছে, তবুও লেখনীকে ক্যাপমুক্ত করলাম। সন্ত্রাসের কাঁটাতারে বিদ্ধ আমি, জঙ্গী জিপের শব্দময় শহরের রুদ্ধবাক বাসিন্দা, গেরিলাদের হঠাত্ পদধ্বনিতে সচকিত, আশান্বিত এক শ্বাসজীবী কিছু কবিতার পঙিক্ত গচ্ছিত রাখতে শুরু করলাম ডায়েরির পাতায়। অত্যন্ত গোপনীতার মধ্যে চলছিল আমার এই অভিযাত্রা। শুধু আমার স্ত্রী, দু’চারজন সুহূদ এবং কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জানতেন সে কথা। খানাতল্লাশীর মরশুমে, ধরপাকড়ের হিড়িকে এই ডায়েরিকেও গা ঢাকা দিতে হয়েছে বার বার। কখনও কোনও আত্মীয়ের বাসায়, কখনও শাড়ির ভাঁজে, কখনও বা রান্নাঘরে সামান্য মশলার নিচে।’ একাত্তরের লেখা কবির বেশির ভাগ কবিতা এই ডায়েরিতেই গচ্ছিত ছিল।
 
স্বদেশের সুদীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামে কবি শামসুর রাহমান তাঁর কবিতার মাধ্যমে যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তত্পূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অবরুদ্ধ ফরাসিদের প্রতিরোধ সংগ্রামে কবি পল এলুয়ার এবং লুই আরাগঁর এরূপ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আমাদের বৈচিত্র্যময় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিসংগ্রামের অনন্য উপাদান হিসাবে শামসুর রাহমানের পুষ্পিত কবিতাসকল বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অসামান্য অংশ হয়ে থাকবে। শামসুর রাহমানের কবিতাকে কতিপয় সাহিত্যবোদ্ধা রাজনৈতিক শ্লোগান সর্বস্ব কবিতা হিসাবে বিবেচনা করতে গিয়ে তাঁর কবিতার চেতনা এবং শিল্প ও সাহিত্যমানকে অগ্রাহ্য করেছেন। অথচ জাতির অভ্যূদয় সংগ্রামের প্রতিটি আন্দোলনকে ঘিরে তাঁর যে কাব্যসাধনা তা শুধু দেশীয় সাহিত্যে নয়; গোটা বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসেও বিরল। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট হাসপাতালের বিছানায় হূদযন্ত্র নিশ্চল হওয়ার আগ পর্যন্ত এই মহান কবি তাঁর মুক্তিসংগ্রামী কলম সমপ্রীতির সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে চালিয়েছেন বিরতিহীন। মুক্তিমুখী জনতার মনের কথা বারবার ভাষা পেয়েছে শামসুর রাহমানের কবিতায়।