থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নিয়মিত একজন সদস্য মেহমুদ সিদ্দিকী লেলিন। বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের একজন সম্ভাবনাময় তরুণ অভিনেতা। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নিয়মিত প্রযোজনাগুলোতে অভিনয় করেন। এছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম নাট্য নির্দেশক কামাল উদ্দিন নীলুর সঙ্গে সিএটিতে কাজ করেছেন ‘ম্যাকাব্রে’ নাটকে। মঞ্চের পাশাপাশি টিভি, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনে নিয়মিত কাজ করেন তিনি। মেহমুদ সিদ্দিকী লেলিনের সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মাহবুব আলম
থিয়েটারের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা কিভাবে হলো?
আমার বেড়ে ওঠা একটি সাংস্কৃতিক পরিবারে। শুনেছি মা ভালো গান করত। কিন্তু আমি যখন জন্মালাম, কী কারণে যেন মায়ের গলা নষ্ট হয়ে গেল! এ জন্য ‘নাড়ি ছেঁড়া ধন’ না হয়ে আমি হয়ে উঠলাম ‘গলা ছেঁড়া ধন’। বড় হলাম। ঢাকায় এসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। আমি ছোটবেলা থেকে নাচ করতাম। তবে অভিনয়ের প্রতি একটা নেশা জন্মে গেল কবে যেন! ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় ঈদের ছুটিতে বাড়ি এলাম। তখন আমার বাবার বন্ধু বলল থিয়েটার আর্ট ইউনিট নামে একটা নাট্য সংগঠনের কথা। বলল, ‘দলটা “কোর্ট মার্শাল” নামক একটা নাটক মঞ্চায়ন করে। ওই নাট্য সংগঠনে প্রশান্ত হালদার নামে একজন আমার পরিচিত রয়েছে। তুমি উনার কাছে যাও। একটা কিছু হবে।’ ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরে দাদার সঙ্গে দেখা করলাম। তখন ২০০৮ সাল। তখন থেকে থিয়েটারে পথচলা শুরু।
অভিনেতা হিসেবে আপনার স্বপ্ন কী?
অভিনেতা হিসেবে নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও অভিনীত প্রতিটি চরিত্রের প্রতি সত্ থাকতে চাই। কারণ ব্যক্তি জীবনের কর্মকাণ্ড অভিনয়ের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। নিজেকে সফল অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। যেহেতু অভিনয়ের সর্বোচ্চ আর্কাইভ সিনেমা। তাই সিনেমায় কাজ করতে চাই। এর পাশাপাশি থিয়েটার করতে চাই। থিয়েটারে অভিনয়ের আলাদা মজা আছে। প্রতি দিনের অভিনয়ে নতুনভাবে চরিত্রকে আবিষ্কার করা যায়।
মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনয়কে কিভাবে পার্থক্য করেন?
আমাদের জেনারেশনের বা এ কর্পোরেট সময়ের ছেলেমেয়েরা এতটা অভিনয়ে যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছে যে, অভিনয়ের প্রতি তাদের অনুভূতি নেই বললেই চলে। থিয়েটারে যেহেতু একটি পাণ্ডুলিপি বা চরিত্র অনেক দিন ধরে আউড়াতে হয়, তাই চরিত্রের গভীরে ঢুকতে হয়। তাই থিয়েটারে অভিনয়কে আমি টিভি মিডিয়ার অভিনয় থেকে আলাদা করি এই ভাবে যে, থিয়েটারে অভিনয় অভিনেতাদের যান্ত্রিক করে না এবং অনুভূতিপ্রবণ অভিনেতা হিসেবে উপস্থাপন করে। আমরা যদি এখন খেয়াল করি, আমাদের দেশের বাইরের অভিনেতারা ন্যাচারাল অভিনয় করেন কিভাবে? এর পিছনে প্রধান কারণ থিয়েটারে অভিনয়। যার প্রতিফল আমরা টিভি মিডিয়ায় তাদের অভিনয় থেকে দেখতে পাই। বেশি দূরে নয়, আমাদের পাশের দেশ কলকাতার অভিনেতাদের দিকে তাকালেই তা দেখতে পাই। সুতরাং থিয়েটার ও মিডিয়ার অভিনয় তফাতটা আসলে অভিনয় সৃষ্টি থেকে নয়, আমাদের যান্ত্রিক সময়ের ফল। আমি মনে করি, থিয়েটার অভিনেতা তৈরির প্লাটফর্ম।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
অভিনয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি-ই যে প্রয়োজন, তা কিন্তু নয়। থিয়েটার থেকেও অভিনয় সম্পর্কে পরিপক্ব হওয়া যায়। তবে একজন পড়াশোনা জানা ও না-জানা অভিনেতার ভিতর পার্থক্য অবশ্যই আছে। আমি মনে করি যে, অভিনয়ের জন্য একজন অভিনেতাকে কোন তত্ত্ব ও কৌশল অনুসারে কোন পথে এগুতে হবে সেটা তাকেই খুঁজে বের করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন অভিনেতাকে একটা গাইডলাইন দেয় মাত্র। এর সঙ্গে অভিনেতা তার অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা যুক্ত করেই মঞ্চে বা টিভি মিডিয়ায় আবির্ভূত হয়। যদি আমার কথাই বলি, আমি ন্যাচার ও আশপাশের মানুষজন থেকে অভিনয়ের জ্ঞান নিতে চেষ্টা করি।
মঞ্চে আপনার অভিনীত প্রিয় চরিত্র কোনটি এবং কেন?
দেখুন, একজন অভিনেতা কখনো নির্দিষ্টভাবে কোনো চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে না। যেমন আমার কথা যদি বলি তবে বলব, আমাদের দলের শেষ প্রযোজনা ‘অনুদ্ধারণীয়’ নাটকের চরিত্র অমিত। আমার এ নাটক উপস্থাপন করতে গিয়ে অমিত চরিত্রটা আমার বেশ প্রিয়। সে হিসেবে এই অমিত চরিত্রটাই এককভাবে জনপ্রিয় চরিত্র হয়ে আমার কাছে থাকবে তা কিন্তু নয়। আমি যখন অন্য কোনো প্রযোজনা দেখব, তখন তার থেকে কোনো চরিত্র আমার মন কাড়তেও পারে! তখন সেটাও আমার প্রিয় চরিত্র হতে পারে। তাই আমার কাছে নির্দিষ্টভাবে কোনো চরিত্রই প্রিয় নয়।