১৯৮৬ সালে জাপান সরকারের অনুদানে প্রতিষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল। রোগীদের উন্নত চিকিত্সা দিতে সেখানে আধুনিক চিকিত্সা সরঞ্জাম সরবরাহ করে জাপান। তবে, সাধারণ মানুষের ভাগ্যে জোটেনি ওই সরঞ্জামে বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা। কারণ, জেনারেল হাসপাতালের ওই আধুনিক যন্ত্রপাতি গিয়ে বসে বেসরকারি ক্লিনিকে; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের গড়া ক্লিনিকে।
অব্যবস্থাপনার সুযোগে ওই সিন্ডিকেট শুধু যন্ত্রপাতিই নয়, দিনের পর দিন চুরি করছে সরকারি ওষুধ। বিক্রি করে দিয়েছে হাসপাতালের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেশিন। হাসপাতালের চিকিত্সকরাও তাদের কাছে জিম্মি। স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভা প্রতিমাসে একবার হওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ বছর পর গত ৫ আগস্ট এই কমিটির সভা হয়েছে। হাসপাতালের ওষুধ কিংবা যন্ত্রপাতি বাইরে পাচারের ঘটনা কখনো ধরা পড়লে তদন্ত কমিটি হয়; কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। নামে-বেনামে একাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক হওয়া এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। যে হাসপাতালটি দেশের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ হাসপাতাল হওয়ার কথা ছিল সিন্ডিকেটের ক্রমাগত লুটপাটে সেটিই এখন রুগ্ন-দুর্বল।
গত মাসে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে কার্ডিওলজি বিভাগের যন্ত্রপাতির জন্য সরকার দশ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে; কিন্তু এইসব যন্ত্রপাতির সুবিধা নারায়ণগঞ্জবাসী বিনামূল্যে পাবে কিনা তা নিয়ে ফের সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সিন্ডিকেটের একজন গত ২৯ বছর ধরে এই হাসপাতালে থেকে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে সামান্য পিয়ন হিসেবে তিনি চাকরি নেন। এখন তিনি চারটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও তিনটি ক্লিনিকের মালিক। এছাড়া তল্লার সবুজবাগ ও সিদ্ধিরগঞ্জের চৌধুরী বাড়ি এলাকায় রয়েছে তার দুইটি বহুতল ভবন।
২০০৬ সালে কেবিনের ভাড়া ও রোগীদের টিকিটের ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সিন্ডিকেটের দুই নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়; কিন্তু মামলাটি উচ্চ আদালত স্থগিত করে। ২০১৪ সালে সিন্ডিকেটের এক নেতার ক্লিনিকে এক শিশুকে মেয়াদোত্তীর্ণ ইনজেকশন পুস করায় শিশুর পিতা আবদুর রশিদ থানায় অভিযোগ করে। পুলিশ তাকে আটক করলেও পরবর্তীতে তিনি ছাড়া পান। জাহান ক্লিনিকে হাসপাতালের ওষুধ বিক্রিকালে তত্কালীন ইউএনও বর্তমানে এডিসি গাউসুল আজম ক্লিনিকের মালিক তাসলিমকে গ্রেফতার করে।
একাধিক চিকিত্সক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি দামি ওষুধ লিখতে পারি না। মাসশেষে মিলে না ওষুধের হদিস। হাসপাতালের সরকারি ওষুধ বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে কার্টনভর্তি দামি এন্টিবায়োটিকসহ এক কর্মচারীকে আটক করা হয়। এর কিছুদিন পর চতুর্থ শ্রেণির শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতাকে বাজারের ব্যাগর্ভতি ওষুধসহ হাসপাতালের কর্মচারীরা আটক করে। পরে এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়। সেটিও আলোর মুখ দেখেনি।
এর আগে এক সিকিউরিটি গার্ড এলাকার যুবকদের হাতে ওষুধসহ আটক হয়। পরে টাকার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হয়। হাসপাতালের মসজিদের সিঁড়ির নিচে চোরাই ওষুধ মজুদ রেখে বিক্রির সময় এক কর্মচারীকে আটক করা হয়। পরে তা একটি রাজনৈতিক দলের নেতার মাধ্যমে রফাদফা করা হয়। গত জুন মাসে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের এক কর্মচারীর মাধ্যমে হাসপাতালের ওষুধ পাচারকালে তা ধরা পড়ে। হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জিকেল মেশিনটি একই বিভাগের এক টেকনেশিয়ান হাসপাতাল থেকে নিয়ে তার নিজস্ব ডেন্টাল ক্লিনিকে স্থাপন করে। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার হয়নি।
গত ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতি ৪৫ দিন পরপর সভা আহ্বানের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, হাসপাতালটির উন্নয়নে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি আমরা ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নিয়েছি। হূদরোগ বিভাগের জন্য সরকারের তহবিল থেকে দশ কোটি টাকা তিনি বরাদ্দ এনেছেন মন্তব্য করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারায়ণগঞ্জে মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে আশ্বাস দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীরা সকল প্রকার সহায়তা করবেন।
নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের সুপার ডা. নিতিশ কান্তি দেবনাথ জানান, হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়মের কথা শুনেছি এবং এসবের তদন্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক বলেন, বিষয়টি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ওষুধ পাচার এবং যন্ত্রপাতি সরানোর পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।