নতুন করে বর্ষা শুরু হওয়ায় সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলা থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও কিছু কিছু স্থানে পানি বাড়ছে। গাইবান্ধায় হুমকির মুখে পড়েছে বামনডাঙ্গায় রেলসেতু। রেললাইন পানিতে ছুঁইছুঁই করছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে প্রতিদিন তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। পদ্মা সেতুর কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডে ভাঙন আপতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে মাওয়ায় পদ্মার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে।
বিয়ানীবাজার (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, সিলেটের সঙ্গে পাঁচ উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন করে বর্ষার কারণে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়ে আরো প্রায় ৮০টি গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের বেশির ভাগ নিচু অংশ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় সিলেটের সঙ্গে বিয়ানীবাজার-সুতারকান্দি, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা ও জুড়ি উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি থাকায় রাস্তা দিয়ে ছোট ছোট যানবাহন চলাচল করছে না। কুশিয়ারায় পানির প্রবল স্রোতে দুবাগ ইউনিয়নের চরিয়া, নয়া দুবাগ মেওয়া, শেওলা ও কুড়ার বাজার এলাকায় একাধিক স্থানে ডাইক ভেঙে গেছে।
রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) ও কাপ্তাই (রাঙ্গামাটি) সংবাদদাতা জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় আমন ফসল, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানি ছেড়ে দেয়ায় এবার রাঙ্গুনিয়ায় ভয়াবহ বন্যা হয়। শস্য ভান্ডারখ্যাত গুমাই বিলে নষ্ট ফসল দেখে হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, শাহজাদপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি ঘটছে। প্লাবিত হয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির। প্রতিদিনই তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। উপজেলার কায়েমপুর, বনগ্রাম, বিআঙ্গারু, সস্তাবাদ, কাশিনাথপুর, সরাতৈল, গালা, হাতকুরা, নন্দলালপুর, ভুল বাকুটিয়া, উলিয়ার চর, আহমদপুর ও সওদামারাসহ বিভিন্ন জনপদের রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজে পানি ওঠায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। শাহজাদপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধিসহ করতোয়া ও বড়াল নদীতেও পানি বাড়ছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি ও সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গাইবান্ধার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার সাত উপজেলার ২৪২টি গ্রামের প্রায় দুই লাখ মানুষ এখন পানিবন্দী হয়ে আছেন। গতকাল বন্যার পানির তোড়ে মহিমাগঞ্জের বোচাদহ গ্রাম সংলগ্ন বালুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় শিবপুর, কোচাশহর ও মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন এবং দরবস্ত ইউনিয়নের দুর্গাপুর এলাকায় সড়ক ভেঙে দরবস্ত ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকা নতুন করে বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও সাব-রেজিস্ট্রার অফিস চত্বর, মহিলা কলেজ এবং উপজেলা পরিষদ ভবন সংলগ্ন কুটিবাড়িও এখন বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। অপরদিকে শান্তাহার-লালমনিরহাট রেল রুটের গাইবান্ধার নলডাঙ্গা থেকে বামনডাঙ্গা পর্যন্ত রেল লাইন বন্যার পানি প্রায় ছুঁই ছুঁই অবস্থা। পানির তীব্র স্রোতের কারণে বামনডাঙ্গা রেল সেতুটি হুমকির মুখে পড়েছে। গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় করতোয়ার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৪ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যান্য নদীর পানি অত্যন্ত ধীর গতিতে কমছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ১ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি। জেলার আত্রাই, রানীনগর ও মান্দা উপজেলার কয়েকশ ঘর-বাড়ি এখনো পানির নিচে। নলকূপ ডুবে থাকায় খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলী ইউনিয়নে রানীনগর তারানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোদাগাড়ী উপজেলার চর নওশেরা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার জুড়ে পদ্মা নদীর তীর ভাঙছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ ফুট নদীর পাড় ভেঙে অর্ধ শতাধিক বাড়ি-ঘর পদ্মায় বিলীন হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পদ্মা সেতুর কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের নদী ভাঙন আপতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বৃহস্পতিবার আর নতুন করে কোন ভাঙন দেখা দেয়নি। বাঁশ ও বালুর বস্তা দিয়ে ভাঙন আটকানো হয়েছে। নতুন করে ভাঙন প্রতিরোধে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে তীব্র স্রোতের কারণে আগামী ১৫ দিন যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে চীনের মেজর ব্রিজ কোম্পানি। এই কোম্পানিটির স্বয়ং জিএম এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এই ভাঙনের কারণে। এদিকে পদ্মা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
সংশ্লিষ্টসূত্র জানায়, কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের দুইটি জেটি রয়েছে। তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুইটি জেটি। ভেসে থাকা জেটির কোন ক্ষতি হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেটির সংযোগ সড়ক ও ক্রেনের রেল লাইন এবং অস্থায়ী কংক্রিট প্ল্যান্ট। ভাঙনের ঝুঁকি বন্ধ হলে এগুলো আবার ঠিক করা অল্প সময়ের ব্যাপার।