শ্যালা নদীতে বেপরোয়া গতিতে ছুটছে নৌযান

কোন ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সুন্দরবনের শ্যালা নদী দিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলছে কার্গো, কোস্টার ও অয়েল ট্যাংকার। ফলে যে কোন সময় আবারো দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা করছে বনবিভাগ। জানা গেছে, সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বনবিভাগের ভূমিকা গৌন। শ্যালা দিয়ে যে সকল নৌযান চলাচল করে সেগুলোর যাতায়াতের সময় নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ড। বনবিভাগের যথেষ্ট জনবল না থাকায় ইচ্ছা থাকলেও এ ক্ষেত্রে তাদের যেন কিছুই করার নেই। আর বিআইডব্লিউটিএ’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কর্মস্থলে না থাকায় জলযানসমূহ ইচ্ছা মতো চলাচল করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 
গত বছর ৯ ডিসেম্বর শ্যালা নদীতে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির পর থেকে এ চ্যানেল দিয়ে সকল ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এর প্রভাব পড়ে মংলা বন্দরসহ দেশের অর্থনীতিতে। এসব কিছু বিবেচনায় রেখে দীর্ঘ প্রায় দেড়মাস পর সরকার আবারো চালু করে চ্যানেলটি। তবে সেখানে শর্ত সাপেক্ষে নৌযান চলাচলের অনুমোদন দেয়া হয়। প্রথমদিকে শর্ত মেনেই এই রুট দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করে। কিন্তু কিছুদিন পেরিয়ে যেতেই সেই নিয়ম এখন অনিয়মে পরিণত হয়েছে। বনের ভিতর দিয়ে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণে                 অবহেলার কারণে নিয়ম না মেনে অহরহ চলছে কার্গো ও কোস্টারের পাশাপাশি অয়েল ট্যাংকারও। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল কর্তা ব্যক্তিরা দায়ভার একে অপরের উপর চাপাচ্ছেন। আর এই সুযোগে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন নৌযান চালকেরা।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে নৌযানসমূহকে শ্যালা নদী দিয়ে প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে জয়মনি ও বগি এলাকা অতিক্রমের শর্ত দেয়া হয়। কারণ যাতে দিনে দিনেই জাহাজগুলো বন এলাকা থেকে বের হয়ে যেতে পারে। ১১ টার মধ্যে যদি কোন নৌযান শ্যালা নদীর দুই মুখ দিয়ে প্রবেশ না করে তাহলে রাত হয়ে যাওয়া আশংকা থেকে যায়। আর রাত হলে পুনরায় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি এ ব্যবস্থা শিথিল করে দিনে দিনে এই চ্যানেল অতিক্রম করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
 
সরেজমিনে দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে শ্যালা নদীর জয়মনি এলাকা অতিত্রুম করছে একটি তেলবাহী ট্যাংকার। ওটি এবাদি-১ নামের জাহাজটি বিকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ শরণখোলা রেঞ্জ অফিস এলাকায় পৌঁছায় বলে জানান সেখানকার সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামাল উদ্দিন। জানা গেছে, জাহাজটি দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাওয়ার কারণেই সন্ধ্যার আগেই বন এলাকা থেকে বের হয়ে যেতে পেরেছে। এ বিষয়ে এক বন কর্মকর্তা বলেন, দ্রুত গতিতে যদি এবাদি যেয়ে থাকে তবে সেটি ঠিক করেনি। স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করাই ভাল, কারণ এতে দুর্ঘটনার আশংকা থাকে কম।
 
সংশ্লিষ্টরা জানান, দ্রুতগতিতে চলাচলের কারণেই যে কোন সময় ডুবো চর ও অপর নৌযানের সাথে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনা ঘটে বনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। গত বছর যে ট্যাংকারটি শ্যালা নদীতে ডুবে গিয়েছিল সেটির পাশ দিয়ে অপর একটি নৌযান দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় ধাক্কা লাগে। এতেই ডুবে যায় টাংকারটি। তবে নিয়মনীতি মেনে ও ধীর গতিতে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে বনবিভাগের তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।
 
এ বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের স্টেশন কর্মকর্তা গাজী মতিয়ার রহমান বলেন, জনবল কম থাকায় শ্যালা দিয়ে যে নৌযান চলাচল করে, তাদের ওপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এটি দেখার দায়িত্ব কোস্ট গার্ডের। তবে এই রুট দিয়ে কার্গো কোস্টার চলাচলের নির্দেশনা থাকলেও ট্যাংকারও চলছে। ট্যাংকার চলাচল করতে পারবে কিনা এ ধরনের কোন পত্র কিংবা নির্দেশ বনবিভাগ পায়নি। তবে কোস্ট গার্ডের কাছে নাকি ট্যাংকার চলাচলের নির্দেশনা এসেছে বলে তিনি জানান।
 
বনের ভিতর দিয়ে নৌযান চলাচলের বিষয়টি মূলত বিআইডব্লিউটিএ’র দেখার কথা থাকলেও বৃহস্পতিবার দুপুরে জয়মনিরঘোলে দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান মার্কিংম্যানকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। সেখানে থাকা অপর দুই কর্মচারী বলেন, আমাদের স্যার গত কয়েকদিন ধরে অফিসের কাজে খুলনায় অবস্থান করছেন।
 
এদিকে বনের ভিতর দিয়ে চলাচলকারী নৌযানগুলোকে পথ দেখাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিআইডব্লিউটিএ’র পাইলট না থাকায় মাঝে মাঝেই দুর্ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ৫ মে সুন্দরবনের ভোলা নদীর বিমলের চরে সার বোঝাই একটি কার্গো জাহাজ ডুবে যায়। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্যালা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করতে হলে দ্রুত মংলা-ঘাসিয়াখালী চ্যানেল চালু করা প্রয়োজন। এই চ্যানেলটি চালু হলে সু্ন্দরবনের ভিতর দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ হবে। এতে রক্ষা পাবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।