শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বার বার স্বর্ণের চালান আটকের ঘটনায় কৌশল পাল্টেছে চোরাকারবারীরা। আগে তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে স্বর্ণ আনলেও এখন বিভিন্ন যাত্রীর মাধ্যমে ছোট ছোট চালানে স্বর্ণ আনছে। এ তথ্য জানিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মঈনুল খান।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় যশোর ও বেনাপোলে ১২০টি স্বর্ণের বার জব্দ ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টয়লেট থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে।
ড. মঈনুল খান জানান, গত দুই বছরে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে জব্দ করা হয়েছে ২৭ মণ স্বর্ণ। এসব চালান জব্দ করার ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে বিমান, সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তাসহ শতাধিক ব্যক্তি। ফলে অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে স্বর্ণ চোরাচালানের সিন্ডিকেট। তিনি আরো বলেন, স্বর্ণ চালানের ঘটনায় শতাধিক মামলা হয়েছে। এরমধ্যে অনেকগুলোর অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। পাশপাশি চোরাচালানের ঘটনায় ইতিমধ্যে যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের কেউ জামিন পাননি। এক প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, স্বর্ণ চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। তবে চোরাচালানীদের ব্যাপারে অধিদফতর কঠোর। কোন অবস্থায় কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। এ ধারা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণ চোরাচালান অনেকটা কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
টয়লেটে সোনা, একজনের জেল
শুক্রবার রাতে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন জোনের টয়লেট (ঝুড়ির মধ্যে টিস্যু পেপার দিয়ে মোড়ানো ছিল) থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করেছে। উদ্বার হওয়া সোনার মধ্যে রয়েছে ১ কেজি ওজনের ১২টি সোনার বার ও ৪ কেজি ওজনের সোনার চেইন। যার বাজার মূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। এ ঘটনায় সিভিল এভিয়েশনের সিভিল এভিয়েশনের ঠিকাদার নুরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে। তিনি ‘নাহিদ ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দরে ক্লিনিং এবং বিলবোর্ড লাগানোর কাজ করে ।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, স্বর্ণ আটকের ঘটনায় সরাসরি নুরুল ইসলামের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। কিন্তু তার গতিবিধি ছিল সন্দেহজনক। তাছাড়া কাস্টমস এলাকায় তার প্রবেশ করার কথা নয়। অবৈধ প্রবেশের অভিযোগে বিমানবন্দরের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক মাসের জেল ও অনাদায়ের পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। তিনি আরো বলেন, এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নুরুল ইসলামের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে।
প্রাইভেটকারে সোনা, ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা পুলিশের
যশোরের বাঘারপাড়ায় শুক্রবার রাতে পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইকৃত একটি প্রাইভেটকার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বার কেজি ওজনের ১১০টি স্বর্ণবার। বাঘারপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ ছয়রুদ্দিন আহমেদ জানান, জব্দ করা প্রাইভেকারটির মালিক নড়াইলের কালনাঘাট এলাকার তৌহিদুর রহমান। তিনি গত বুধবার নড়াইল থেকে খুলনা যাচ্ছিলেন। এসময় যশোরের ঝিকরগাছা থানার কনস্টেবল মিজান দলবল নিয়ে প্রাইভেটকারটি ছিনতাই করেন। আর গাড়ি ছিনতাইয়ের অভিযোগ জানিয়ে তৌহিদুর রহমান বুধবার রাতেই বাঘারপাড়া থানায় দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, খুলনার পথে যশোরের গাবতলা ব্রিজের কাছে পৌঁছলে দুটি মোটর সাইকেলে ৫-৬ জন ব্যক্তি তাদের গতিরোধ করে। এ সময় কনস্টেবল মিজানসহ অন্যরা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে চালক মালেকের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন। ‘গাড়িতে অবৈধ সোনা রয়েছে এবং থানায় নিয়ে গাড়ি তল্লাশি করা হবে’- বলে মিজান গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেন। পিস্তল দেখিয়ে সবাইকে চুপ করে বসে থাকতে বলে মিজান নিজেই গাড়িটি চালিয়ে কাছের একটি ইটভাটায় নিয়ে যান। সেখানে গাড়ির চালক ও আরোহীকে বেধড়ক পেটানোর পর তাদের কাছে থাকা নগদ চার হাজার ৭০০ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় ।
ওসি বলেন, এরপর মিজান ও তার সঙ্গীরা গাড়িটি নিয়ে যাওয়ার সময় পথে ধলগ্রাম রাস্তার মোড়ে বাঘারপাড়া থানার দায়িত্বরত সাব ইন্সপেক্টর তরুণ কুমার কর গাড়িটি আটকান। তখন অন্যরা পালিয়ে গেলেও মিজান ধরা পড়েন। তিনি আরো বলেন, আটকের পর কনস্টেবল মিজান দাবি করেন, তার সঙ্গে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ওয়াচার সাতক্ষীরায় কর্মরত লিপ্টন, পাবনার সুজানগর থানার কনস্টেবল রুবায়েত হোসেন, অভয়নগরের মোশাররফ ও আশরাফ নামে দুই ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। তবে আটকের পরদিন ভোরে থানা থেকে পালিয়ে যান কনস্টেবল মিজান। পরে শুক্রবার রাতে প্রাইভেটকারটি তল্লাশি করে স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়।
ওসি আরও বলেন, এ ঘটনায় সাব-ইন্সপেক্টর সাদেকুর রহমান বাদি হয়ে প্রাইভেটকারের মালিকসহ দশ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন। ঘটনার পর থেকে প্রাইভেটকার মালিক তৌহিদুর রহমানও পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। গ্রেফতার হলেই জানা যাবে স্বর্ণবারের রহস্য।
ওসিসহ তিন পুলিশ প্রত্যাহার
এদিকে থানা থেকে কনস্টেবল মিজান পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে বাঘারপাড়া থানার ওসি কাইয়ুম আলী সরদার, এএসআই নাসির ও কনস্টেবল ওলিয়ার রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার নতুন ওসি হিসেবে যোগদান করেন ছয়রুদ্দিন আহমেদ।
১০ স্বর্ণের বারসহ যুবক আটক
যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচারের সময় ১০টি স্বর্ণের বারসহ তৌহিদুল ইসলাম নামে এক যুবককে আটক করেছে বিজিবি। বেনাপোল পোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ অপূর্ব হাসান জানান, শনিবার দুপুরে বেনাপোলের পুটখালি সীমান্তের বটতলা এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে তৌহিদের দেহ তল্লাশি করে স্বর্ণের বারগুলো জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।