প্রধান বিচারপতির নির্দেশে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দ্বিতীয় চিঠির জবাব দিয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। চিঠিতে তিনি বলেছেন, আমার বিদায় লগ্নে প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপনার জিঘাংসামূলক আচরণ সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গের শামিল, এতে ন্যায় বিচার ব্যাহত এবং বিচারালয়ের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়। চিঠিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপনি সহকর্মী বিচারকদের আপনার কোন আদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে অভিহিত করার অধিকার রাখেন না। প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে আমাকে আপনার কল্পনাপ্রসূত আদেশ অভিহিতকরণের মধ্য দিয়ে যে অসম্মান ও অসৌজন্যতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সহকর্মী বিচারকগণের সঙ্গে তার পুনরাবৃত্তি না করার জন্য অনুরোধ করছি।
বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর ১২ মাসের নগদায়ন ও আনুতোষিক (ফুল পেনশন) সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধান বিচারপতির একটি নির্দেশনা গত ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম চিঠি দিয়ে তাকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি চৌধুরী গত ৩১ আগস্ট প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে একটি পাল্টা চিঠি দেন। গত ২ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. জাকির হোসেন বিচারপতি চৌধুরীকে আরেকটি চিঠি লিখেন। গতকাল মঙ্গলবার এর জবাব দেন তিনি।
এতে বিচারপতি শামসুদ্দিন বলেন, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে দিয়ে একজন আপিল বিভাগের বিচারপতিকে চিঠি দেয়া শুধু অশোভনীয় ও অসৌজন্যমূলকই নয়, সহকর্মী বিচারকগণের প্রতি চরম হেয় ও অবমাননারও বহি:প্রকাশ। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে নিজ নাম ও স্বাক্ষরসহ আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে চিঠি লিখতে নির্দেশ দিয়ে এবং তার স্বাক্ষর ও নামে চিঠি প্রেরণ করে আপনি মূলত সুপ্রিম কোর্টের সকল বিচারপতিকেই অসম্মান করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল প্রধান বিচারপতির রেজিস্ট্রার নন, তিনি সুপ্রিম কোর্টের সকল বিচারপতিগণের রেজিস্ট্রার।
আপনার পত্রে আমাকে ‘ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী’ উল্লেখ করেছেন এবং আমি ‘পেন্ডিং রায় না লিখে বিদেশ চলে যেতে পারি’ মর্মে ‘সংশয়’ প্রকাশ করেছেন যা উদ্ভট, হাস্যকর, কল্পনাপ্রসূত, সৌজন্য বহির্ভূত ও সম্মানহানিকর। বিচারপতি হিসেবে আমি আমার সাংবিধানিক শপথ রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। পেন্ডিং মামলার রায় না লিখে বিদেশ চলে যাওয়ার মত অসুস্থ চিন্তা কোন সত্, নীতিবান, দেশপ্রেমিক বিচারপতি করতে পারেন না। ‘ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী’ না হয়েও যে কোন বিচারপতি বিদেশ যেতে পারেন। তবে প্রসঙ্গত: উল্লেখ করতেই হয় যে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনই সরে দাঁড়াতে পারে না। একজন রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্যরাই কেবল দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারে যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।
আপনার প্রেরিত পত্রে আপনি ‘যদি’ ও ‘সংশয়’ শব্দসমূহের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ‘যদি’ এবং ‘সংশয়’ শব্দসমূহের ভিত্তিতে একজন বিচারপতি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। একজন বিচারককে সকল ‘সংশয়’ এর উর্ধ্বে উঠে ন্যায় বিচারের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন বিচারককে সিদ্ধান্ত নিতে হয় দৃশ্যমান ঘটনার ভিত্তিতে, কল্পনার ভিত্তিতে নয়। ‘যদি’ এবং ‘সংশয়’ এর ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা হবে অলীক, কল্পনাপ্রসূত ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থি। প্রধান বিচারপতি কাল্পনিক ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বিচার ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসবে। আপনার ‘যদি’ এবং ‘সংশয়’ এর আশংকা এই দেশের জনসাধারণকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করবে ও বিচারালয়ের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করবে। আপনার পত্রে বর্ণিত শব্দ প্রয়োগ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, কোড অব কনডাক্ট, জাজেস অব সুপ্রিম কোর্ট এর আওতায়, আমার প্রতি আপনার আচরণ ‘ডিগনিফাইড’ ও ‘রেসপেক্টফুল’ নয়।
চিঠিতে বলা হয়, সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সকল বিচারপতিই সাংবিধানিক পদের ধারক। কোন বিচারপতিই প্রধান বিচারপতির অধস্তন নহেন। আইনের ভাষায় বলা হয় বিচারপতিদের তুলনায় প্রধান বিচারপতির অবস্থান ‘প্রাইমাস ইন্টার পেরেস’ অর্থাত্ তিনি সহকর্মীদের মধ্যে প্রথম। সংবিধানের অনুচ্ছেদ মতে প্রতিটি বিচারকই বিচারিক ব্যাপারে স্বাধীন, প্রধান বিচারপতির অধস্তন নহেন। আপনার ২ সেপ্টেম্বরের পত্রে, “উক্ত রায়ের নথিগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফেরত প্রদান করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো” মর্মে মামলার নথি ফেরত চাওয়ায় সংবিধানের ৯৪(৪) ধারা মোতাবেক আমার স্বাধীন বিচার ও রায়দানের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ স্বরূপ, যা পুনরায় আমার প্রতি আপনার “ইল উইল” এর সুস্পষ্ট বহি:প্রকাশ যা সংবিধানের ১৪৮ ধারা মোতাবেক প্রধান বিচারপতির সুস্পষ্ট শপথভঙ্গ।
অতীতে কোন বিচারপতিকেই এভাবে পেনশন গ্রহণের পূর্বে ফাইল ফেরত দিতে বলা হয়নি বিধায় আমার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং ফাইল ফেরতের কথা বলে আপনি বৈষম্যমূলক, আইন ও সংবিধান বিরোধী আচরণ করেছেন এবং এহেন কাজের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রধান বিচারপতির পদকে অসম্মান এবং শপথ ভঙ্গ করেছেন। অতীতে সকল বিচারপতিই অবসরের পর কয়েক মাস, এমনকি বছর নিয়েছেন অসমাপ্ত রায় শেষ করতে, এটা আপনার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই হবে। আপনার কাছে বর্তমানে দরখস্তের অপেক্ষায় বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে কয়েক মাস ধরে। অতীতের সকল বিচারপতিই অবসরের পরও রায় লিখেছেন এবং ভবিষ্যতে তা হবে এটাই স্বাভাবিক।
সর্বশেষ আমার বিদায়লগ্নে বলতে চাই যে, প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপনার জিঘাংসামূলক আচরণ সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গের শামিল, এতে ন্যায় বিচার ব্যাহত হয় ও বিচারালয়ের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়। প্রধান বিচারপতি হিসেবে আপনি সহকর্মী বিচারকদের আপনার কোন আদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে অবহিত করার অধিকার রাখেন না। প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে আমাকে আপনার কল্পনাপ্রসূত আদেশ অবহিতকরণের মধ্য দিয়ে যে অসম্মান ও সৌজন্যহীনতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আমার সহকর্মী বিচারকগণের সঙ্গে ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি না করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।