চাঁদপুর সেচ প্রকল্পে ভেঙে পড়েছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা

অব্যবস্থার কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের (সি আই পি) পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানসহ পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকা জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখার জন্য ’৭৫ সালে সি আই পির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। রায়পুর রামগঞ্জ, লক্ষীপুর সদর (আংশিক), ফরিদগঞ্জ, হাইমচর ও চাঁদপুর সদর উপজেলা (আংশিক) প্রকল্পের আওতাধীন। প্রকল্পের পানি চলাচলের অন্যতম চ্যানেল বেড়ি বাধ সংলগ্ন ৯০ কি.মি. দীর্ঘ ও ৬০ফিট প্রশস্ত বোরা পিট খালের বহুস্থানে প্রভাবশালী এক শ্রেণির লোক নাইলনের মোটা রশির নেটের বেড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। প্রকল্পের ভেতরে জালের মত ছড়িয়ে থাকা ১ হাজার ২শ কি. মি. সেচ খালের মধ্যে বহু স্থানে মাছ ধরা এবং মাছ চাষের নামে মাটির বাঁধ ও নেট দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
 
বাগান-বাড়ি বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়ে বহু বাড়িঘর দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। গত ২৫ হতে ৩০ বছর ধরে লাগামহীন ভাবে তৈরি হয়ে আসা মনুষ্য সৃষ্ট এ সকল প্রতিবন্ধকতার কারণে ২২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা সম্পন্ন রায়পুরের ৪ বেন্টের হাজিমারা রেগুলেটর দিয়ে প্রকল্পের পানি নিষ্কাশন কাজ মারাত্মক ভাবে ব্যহত হচ্ছে।
 
এখন প্রকল্প এলকার প্রায় সব স্থানে প্রকট জলাবদ্বতার সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্বতার কারণে কৃষকদের আবাদ করা ক্ষেতের ফসল শাক-সবজি বিনষ্ট হয়। দরিদ্র কৃষকরা সর্বশান্ত হয়ে পড়ে। চলতি মৌসুমে আমন চাষের জন্য পস্তুতি নিয়ে রাখা ১০ হাজার একর জমি অনাবদি অবস্থায় পড়ে থাকবে। প্রকল্প এলাকায় এ বছর ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। প্রকল্প এলাকায় ২৫ হাজার পুকুরে মাছ চাষ হয়। বহু পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে যায়। বাড়ি ঘর উঠানে পানি উঠায় পরিবার পরিজন নিয়ে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানি নামতে না পারায় বহুস্থানে ৬ মাস পর্যন্ত স্থায়ীভাবে থাকা জলাবদ্ধতা হতে সৃষ্ট দুর্গন্ধ পরিবেশকে দূষণীয় করে ফেলে। এতে লোকজনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। IMG0
 
রায়পুর উপজেলা প্রকৌশলী আকতার আহমেদ জানান, জলাবদ্ধতায় গ্রামীণ পাকা রাস্তাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকসহ স্থানীয় লোকজন জানান, মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা পাউবোর লোকজনকে পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরে পাউবোর ফরিদগঞ্জ ও রামগঞ্জ উপসহকারী প্রকৌশলী অফিস এবং রায়পুর উপ বিভাগীয় অফিসে কর্মকর্তা কর্মচারী কেউ বসেন না। দুর্বৃত্তরা রায়পুর অফিসের দরজার কপাট ও জানালার গ্রিলসহ মূল্যবান সামগ্রী চুরি করে নিয়ে গেছে। সিআইপি সংশ্লিষ্ট উপজেলা উন্নয়ন সভার সদস্য হয়েও পাউবোর কেউ উন্নয়ন সভাগুলোতে উপস্থিত থাকছেন না। 
 
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আলম জানান, উপজেলা উন্নয়ন সভার সদস্য হওয়ার পরও পাউবোর কেউ উন্নয়ন সভায় উপস্থিত থাকেন না। অফিসেও তাদের কাউকে পাওয় যায় না। এতে উপজেলা প্রসাসনের সঙ্গে পাউবোর কাজের সমন্বয় করা যাচ্ছে না। জুলাই মাসের টানা বৃষ্টিপাতের সময় রামগঞ্জের দাসপাড়া ভাংগা স্লুইসগেইট দিয়ে স্রোতের বেগে ২০ দিন ধরে বাইর হতে প্রকল্পের ভিতরে পানি প্রবেশ করে চলতি আমন মৌসুমে জলাবদ্ধতা ভয়বহ রূপ ধারণ করে। 
 
পশ্চিম লক্ষীপুর গ্রামের মোহাম্মদ হোসেন, ছাদেক আলী, খগেন্দ্র, অবনি মজুমদার, সোনাপুুর গ্রামের শাহ আলম, রুহুল আমিন, খোরশেদ মনির আহমদ, চরপাতা গ্রামের পেয়ার আহমদ, নুরনবী, নুর হোসেনসহ স্থানীয় বহু কৃষক জানান, এবারের ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় তাদের সহ বহু কৃষকের আমনের বীজতলা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে প্রকল্প এলাকায় ১০ সহস্রাধিক একর জমি আমন চাষবিহীন অবস্থায় খালি পড়ে থাকবে। IMG1
 
সি আই পির নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, হাজীমারা রেগুলেটর ছাড়াও জরুরি প্রয়োজনে ১২শ কিউসেকের চরবাগাদী পাম্প হাউজ দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হয়। প্রতিবন্ধকতামুক্ত এবং পরিকল্পিত ভাবে নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখলে প্রকল্প এলাকা জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখা সম্ভব। 
 
নির্বাহী প্রকৌশলী (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মোহাম্মদ রফিক উল্ল্যা জানান, লোকবলের অভাবে মাঠ পর্যায় এবং অফিসে কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। দাসপাড়া স্লুইস গেইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রসাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পানি নিষ্কাশন পথের বাধাগুলো অপসারণের ব্যবস্থ নেয়া হবে।