মিতুদের বাসায় আজ অনেক লোক। মিতুর একটি ভাই হয়েছে। মা ও ভাই ক’দিন হাসপাতালেই ছিল। আজ হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে। তাই দেখতে এসেছে সবাই। মামা চাচা মামি চাচী খালা ফুফু নানী সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভেতরের ঘরে। ওখানেই ভাইকে নিয়ে খাটের ওপর শুয়েছিল মা। বাবা মিতুর সাথে ছিল পাশের ঘরে। এখন নেই। বাবাও ভেতরের ঘরে।
মিতুও পাশের ঘরে ঘুমিয়েছিল। হঠাত্ তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙতেই বুঝল ঘরে অনেক অতিথি, যেন হাট বসেছে। অথচ মিতু সেখানে নেই। কেউ তাকে ডাকছেও না। হয়তো কারো মনেই নেই মিতু নামের একটি মেয়ে এ বাসায় আছে। এ কেমন কথা!
একা একা বসে এসব ভাবতে আর ভালো লাগছে না মিতুর। ইচ্ছে হলো ভেতরের ঘরে একটু উঁকি দিয়ে দেখি। ওখানে হচ্ছেটা কী!
ভাবতে ভাবতে মিতু গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে থাকে। ভেতরের ঘরের দরজার পর্দার আড়ালে এসে দাঁড়ায়। দেখে কি, শুধু হাট নয়, চাঁদের হাট বসেছে। হাসি আনন্দ আমোদ যেন উপচে পড়ছে। কী না হচ্ছে সেখানে। তোয়ালে দিয়ে জড়ানো ভাইকে একবার ও কোলে নিচ্ছে তো আরেকবার ও। আর বলছে কি, দেখতে একেবারে চাঁদের মতো হয়েছে। কে যেন বলল, আরে না, চাঁদের মতো নয়, গোলাপ ফুলের মতো। দেখ না কেমন গোলগাল।
এসব দেখেশুনে যেন মিতুর গা জ্বলে উঠল। ঢং দেখে আর বাঁচি না! এতদিন তোমরা এই মিতুকে নিয়েই এসব করেছ। এখন মিতু তোমাদের কেউ নয়! ওই পিচ্চিটাই সব! থাকো তোমরা ওকে নিয়ে।
দরজা থেকে ফিরে আসছিল মিতু, এমন সময় তার চোখে পড়ল, টেবিলের ওপর কতগুলো খেলনা ও জামা-কাপড়। আচ্ছা, পিচ্চিটার জন্য আবার এসবও আনা হয়েছে! আমার জন্য আর কিছুই না!
মিতুর ছোট বুকটা যেন এবার ফেটে যাওয়ার জোগাড়। কোনোমতে কান্না চেপে ফিরে এল সেখান থেকে। পাশের ঘরের বিছানায় উঠে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল চুপচাপ।
বুয়ার ডাকাডাকিতে যখন মিতু জেগে উঠল তখন বেশ রাত। বিছানায় শোয়ার পর কখন যে ঘুম এসে গিয়েছে বুঝতে পারেনি। এর মাঝে বাসা ফাঁকা। অতিথিরা সবাই যে যার বাসায় ফিরে গেছে। কেউ তাকে ডাকেনি।
বুয়া মিতুকে ডেকে বলল, খাবে, এসো।
মিতু উঠতে চাইছিল না। কিন্তু বুয়ার ডাকাডাকিতে না উঠে পারল না। খাবার টেবিলে এসে দেখে বাবা বসে আছে। আজ বাবা-মা কেউ তাকে খেতে ডাকেনি। হঠাত্ যেন কেমন হয়ে গেল সব।
রাতে খেয়ে মিতু আবার শুয়ে গেল চুপচাপ। সকালেও ডেকে তুলল বুয়া। ভ্যানে করে গেল ইশকুলে, ফিরে এল দুপুরে। মিতু ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আগে ইশকুলে আনা নেওয়া করত মা। ইশকুলে থেকেই মাঝখানে টিফিন খাওয়াত নিজের হাতে। সেই মা এখন পড়ে আছে ভাইকে নিয়ে। ভাবলে মিতুর কেমন যেন লাগে।
ক’দিন যেতে না যেতেই আরো নতুন কিছু দেখল মিতু। ভাইয়ের নাম রাখা হয়েছে তার নামের সাথে মিলিয়ে—পৃথু। বাবা-মা’র মাঝখানে আগে শুত মিতু। এখন সেখানটায় শোয় ভাই। ইচ্ছে হলেই এখন মা-বাবাকে একসাথে জড়িয়ে ধরতে পারে না মিতু। এ জন্য বুকটা হাহাকার করে ওঠে হঠাত্।
আরো ক’দিন পরের কথা। গ্রাম থেকে বেড়াতে এসেছে দাদিমা। এসেই কোলে টেনে নিল ভাইকে। আর যেন কোল থেকে নামানোর নাম নেই। অথচ আগে এই দাদির বুকের সব আদর ছিল শুধু মিতুর জন্য। শেষে কিনা দাদিও বদলে গেল এমন! ভাইয়ের মাঝে কী পেল সবাই! ভাইকে পেয়ে সবাই এমন দূরে ঠেলে দিল আমাকে! পিচ্চিটাই আমার সব আনন্দ-সুখ কেড়ে নিল!
দেখতে দেখতে দু’বছর কেটে গেল। ছোট ভাই পৃথু এখন কথা বলতে শিখেছে। সারাক্ষণ আপু ডেকে ডেকে অধীর করে তোলে মিতুকে। আর জড়িয়ে ধরতে চায় যখন তখন। ভাইয়ের কচি গলায় আপু ডাক শুনতে ভালোই লাগে মিতুর। কিন্তু যখনই কোলে নিতে হাত বাড়ায়, তখন মনে পড়ে এই পিচ্চিটাই বাসায় তার সুখ-আনন্দ সব শেষ করে দিয়েছে। অমনি ভাইকে কোলে নেওয়ার ইচ্ছে উড়ে যায় তার। আর কোলে নিতে পারে না সে।
আরো ছয় মাস পরের কথা। একদিন সন্ধ্যাবেলা। বাবা-মা গেছে ডাক্তারের কাছে। বুয়া গেছে গ্রামের বাড়ি। অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। বাজ পড়ছে থেকে থেকে। বাসায় এখন শুধু ভাইবোন দুজন। বাতি জ্বালিয়ে পড়ার টেবিলে বই খুলে বসেছে মিতু। পাশেই বসে আছে ছোট ভাই পৃথু। হঠাত্ কী হলো কে জানে। ভাইকে জড়িয়ে ধরে দালান কোঠা কাঁপিয়ে চিত্কার করে উঠল মিতু—ভূ-উ-ত!
আপুর কাণ্ড দেখে নড়েচড়ে বসল ছোট ভাই। শান্ত গলায় বলল, কোথায় ভূত?
ওই যে ডাইনিং টেবিলের নিচে, জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে আছে।—মিতু ভাইয়ের মাথার আড়ালে চোখ লুকিয়ে বলল।
ছোট ভাই পৃথু আবারও ধীর গলায় বলল, ওটা ভূত নয় আপু, বেড়াল। তুমি বেড়ালকে ভয় পাও!
মিতু এবার কোনোমতে চোখ তুলে তাকায়। লজ্জা পাওয়া গলায় বলে, বেড়াল!
বলতে বলতে ভাইকে এবার সত্যিকারের আদরে কোলে টেনে নেয় মিতু। মনে মনে বলে, ভাগ্যিস, ভাইটি সাথে ছিল, তা না হলে আজ কী যে হতো!