সাতক্লংপাই

লোহাগড়া হয়ে কেয়াজু পাড়া বাজারে পৌঁছেছি যখন, তখন দুপুর। এখান থেকে হেটে ঘণ্টা তিনেকের পথ চাম্পাঝিড়ি। এছাড়া জিপ বা চান্দের গাড়িতে যাওয়া যায়। তবে আমরা একটা মোটরসাইকেল নিলাম। জানলাম ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে পৌঁছাতে। সঙ্গে ছড়াকার বোরহান মাসুদ। বোরহানের পাহাড়ে আসা এই প্রথম। যা দেখছে তাতেই ও চোখ কপালে তুলে বলছে, ভাইয়া, এমন তো আগে দেখিনি। পাড়ায় পৌঁছানোর আগেই ওর যে মুগ্ধতা, ওর জন্য যে কী দারুণ এক জগত্ অপেক্ষা করছে ও জানেও না।

আমাদের মোটরসাইকেল প্রস্তুত। ড্রাইভার ইকবাল চলে এসেছে, বোরহানকে মাঝখানে বসিয়ে আমি পেছনে চেপে বসলাম। ড্রাইভারের প্রাথমিক নির্দেশনা হচ্ছে যত পারা যায় চাপাচাপি করে, শরীরের সঙ্গে শরীর মিলিয়ে বসতে হবে। কারণ পাহাড়ি পথে ওপরের দিকে ওঠার সময় পেছনে ওজন বেশি হয়ে গেলে গাড়ি উল্টে যাবে। আমরা তা-ই করলাম। যাতে গাড়ি উল্টে না যায়। গাড়ি চলছে পাহাড়ি পথে একবার সোজা আকাশ পানে উঠে যায় আবার সোজা আকাশ থেকে পাতালে নেমে আসে—এই হলো পাহাড়ি পথে মোটর সাইকেলে চড়া। পাহাড়ি পথে আশপাশ, সবুজ ধরণী আর আকাশের মিতালীর শৈল্পিক মিলনের দৃশ্য অবলোকন করতে করতে বন্ধুর পথের পরানের ত্রাহি কান্না ভুলে গিয়েছিলাম। হঠাত্ আকাশ ফুঁড়ে মোটরসাইকেল উঠে যাওয়ার সময় আবার অনুধাবিত হলো পরানের ভীত কান্না। পাহাড়ি পথে আমাদের শহরের চুকুর ফলের সারি দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না। ফলগুলো এমন লাল—স্ট্রবেরির মতো লাগছে। ফল ও গাছ পুরোটাই লাল। পরে জেনেছি পাহাড়িরা এই ফলের চামড়া ছাড়িয়ে শুকিয়ে চা খায়। আশ্চর্য হয়েছি এই ভেবে, একই জিনিস আফ্রিকায় দেখেছি। আরবে ও আফ্রিকাতে এই পানীয়কে বলে কেরকেডি। আমাদের সংবাদপত্রের এক ফিচারে অবশ্য ভুলভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল এই পানীয়টাকে। এই চুকুর ফল সারা বাংলাদেশেই খুব জনপ্রিয়। সেই লেখায় লেখক একজন উদ্যোক্তার নাম বলে জানিয়েছিলেন, উদ্যোক্তা বিদেশ থেকে এর গাছ সংগ্রহ করে বাংলাদেশে চাষ করেছেন। তার মানে আগে ছিল না। কোনো বিষয়ে লিখতে তথ্য দিতে লেখকদের আরো সাবধনতা অবলম্বন ও আরো বেশি জানার প্রয়োজন আছে বৈকি। ফিরে যাই চাম্পাঝিরি পাড়ায়। সারি করা নতুন টং ঘর-এর নতুন পাড়া ছাড়িয়ে যখন চাম্পাঝিরি পাড়ায় পৌঁছেছি, বিকাল হয় হয়।

পাড়ার শুরুতে পাহাড়ের মাথায় টং বাড়ি। একটু সমতলে গিয়ে বড় উঠান, উঠানটি পাহাড়ের মাথায়। উঠানের কোনায় তেঁতুল গাছ, গাব গাছ, বড়ই গাছ, আম গাছ, পেয়ারা গাছ, কলা গাছও আছে। আছে হালের একাশি গাছও। উঠানের মাঝে আছে গোত্রপ্রধান কারবারির কিম বা মাচান করা বসত ঘর। উঠানের শেষ মাথায় আছে কারবারির আরেকটা কিম। যেটাকে সমতলের বাংলাঘরের ন্যায় ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকে সোজা রাস্তা নেমে গেছে নিচে, যেখানে ঝরনা। উত্সব উপলক্ষে বাড়ির চৌহদ্দিতে সাজ সাজ রব। পুরুষদের মতো মেয়েরাও কাজে ব্যস্ত। দূরের ঝরনা থেকে পানি আনার কাজ করছে, দলবেঁধে মেয়েরা। উঠানের তেঁতুল গাছের নিচে বসে বাঁশ থেকে ছাল তুলে দক্ষ হাতে ফুল বানানোর কাজ করছে কয়েকজন, বড় গামলায় পানিতে রঙ গুলিয়ে সেই ফুলে রং করা হচ্ছে। অন্য পাশে চলছে বাঁশ নকশা করার কাজ। বাড়ির শেষ মাথার ঘরের মাচানে চলছে পাকা বুদুমের (পাহাড়ি লাউ) খোল আর বাঁশ দিয়ে বানানো বাঁশি বা প্লুং সাইয়ের কাজ। সাতপাইক্লং-সহ অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের পর প্লুংগুলোকে যত্ন করে রেখে দেয়া হয়। সেই পুরনো প্লুংগুলো বের করে সারাইয়ের কাজ চলছে। কারবারি নিজে ও আরো কয়েকজন মিলে এই সারাইয়ের কাজ করছেন। প্লুং-এর টুং টাং সুরের মূর্ছনার সঙ্গে চলছে আররাক পান।

উঠানের মাঝখানে একটা গরু বেঁধে গরুকে বেষ্টন করে বাঁশ পুঁতে পিঞ্জরায় আবদ্ধ করা হচ্ছে। সেই বাঁশের ওপর রঙ করা বাঁশের ছাল দিয়ে বানানো ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে সেই পিঞ্জরা। এটাই সাতক্লংপাই উত্সবের কেন্দ্রবিন্দু। চাম্পাঝিরির ম্রো-রা এই অনুষ্ঠানকে সাতক্লংপাই বলে থাকেন তবে আলীকদম ও রাঙামাটিতে এই উত্সবকে ‘চিয়া চট প্লাই’ বলে থাকে। যার অর্থ গো-হত্যা উত্সব। অন্যদিকে বড় একটা বাঁশকে সাজানো হচ্ছে একই রকম ফুল দিয়ে। সাজিয়ে বাঁশটাকে কারবারির বাড়ির মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। যাতে করে দূর থেকে যে কেউ বুঝতে পারে সাতক্লংপাই-এর খবর। একজনের কাঁধে ব্যাটারি অন্য আরেকজনের কাঁধে মাইক নিয়ে কিশোরদের একটা দল আসছে উঠানের দিকে। জানা গেল প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে আলীকদম থেকে মাইক নিয়ে এসেছে তারা। বাড়ির ভিতর চলছে আসর। প্লুং বাজিয়ে যাচ্ছে অনবরত কেউ, চলছে আররাক। আর তাদের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার গল্প।

সন্ধ্যা নেমে আসে চাম্পাঝিরি পাড়ায়। শুরু হয় উত্সবে অংশগ্রহণকারীদের সাজগোছ। ভিতর ঘরে মেয়েরা পুরনো মালা সব খুলে বসেছে। যেগুলো ছিঁড়ে গেছে সেগুলো নতুন করে সুতা লাগানোর কাজ চলছে। মাথায় গোঁজার জন্য সংগ্রহ করা আছে কাপড়ের বড় আকারের ফুল। আজকে কে কাকে কতটা আকর্ষণীয় করে তুলে ধরতে পারে, চলছে সেই প্রস্তুতি। আর দেদার আররাক পানের প্রতিযোগিতা। পানের ফলে উত্সবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার আগেই অনেকে বিদায় নিয়েছেন দৃশ্যপট থেকে।   

একসময় শুরু হলো উত্সব। সারি বেঁধে ছেলেরা বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে। বাঁশিওয়ালাদের সামনে রেখে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েরা। বাঁশির সুরের তালে তালে নৃত্য করতে করতে গরুকে বেষ্টন করে রাখা পিঞ্জরা প্রদক্ষিণ করে চলেছে অংশগ্রহণকারীরা। সময় গড়াচ্ছে আর অংশগ্রহণকারী বাড়ছে। নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গে চলছে গলায় ঝুলিয়ে রাখা বুদুমের পাত্র থেকে পান।

মুরংদের পোশাক-পরিচ্ছদ খুবই সাধারণ, উত্সবেও তা লক্ষ করা যায়। পুরুষরা পরে নেংটি আর মেয়েরা পরে ওয়াংলাই নামের কোমর থেকে নিচের দিকে ৮-১০ ইঞ্চি পরিমাণ পরিধেয় কাপড়। মাঘ মাসের হাড় কাঁপানো শীতেও তারা খালি গায়ে থাকে। পোশাক-পরিচ্ছদ ছাড়াও মেয়ে-পুরুষ উভয়ে বিচিত্র ধরনের মালা-গয়না পরে। রুপার অলঙ্কার ও পুঁতির মালা তাদের খুবই প্রিয়। মুরংরা আদিম পরিবেশে থাকতে বেশি ভালোবাসে। ভাত ও মদ মুরংদের প্রধান খাদ্য। মদ তারা নিজেরাই তৈরি করে। মেয়েরা পায়ে ‘কক ক্যান’ বা নূপুর, কোমরে ‘রকম’ বা বিছা পরে। পুরুষরা ‘ডং’, বিদ্রি বা লেংটি পরিধান করে। মুরং মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও মাথায় লম্বা চুল রাখে। নারী-পুরুষরা অনেকে মাথায় ‘চুরুত’ চিরুনি গেঁথে রাখে। কেউ কেউ আবার মাথার চুলকে খোঁপা আকারে বেঁধে রাখে। মুরং মেয়েরা মাথায় কানে ও খোঁপায় বিভিন্ন ধরনের ‘পাও’ বা পাহাড়ি ফুল গুঁজে রাখে।

রাত দ্বি-প্রহরে গিয়ে শেষ হয় নৃত্য। তবে যারা খুব ধার্মিক তারা কিন্তু থেকেই যায়। গরুর পিঞ্জরা বেষ্টন করে বাঁশি বাজিয়ে যায় আর ঘুরতেই থাকে। সকাল হলে সকলে একসঙ্গে হয়ে পিঞ্জরার ভিতরের গরুকে বধ করে। গরু কেটে রান্না করে খেয়ে তবেই সম্পন্ন হয় সাতক্লংপাই বা গো হত্যা উত্সব। উত্সবে গো হত্যার মাধ্যমে তারা তাদের সৃষ্টিকর্তা তুরাইকে তুষ্ট করে বাড়ি ফেরেন।

তুরাই ছাড়াও ওরেং ও সুতিয়াং নামে আরো দুজন দেবতা রয়েছেন। বছরের বিভিন্ন সময় শূকর, মোরগ-মুরগি, কুকুর, কবুতর ইত্যাদি বিধাতার নিকট অর্পণ করে মুরংরা। সংসারের যাবতীয় কাজে সফলতা এবং ব্যক্তিজীবনে সর্বময় মঙ্গল কামনায় তারা এসব পূজা- পার্বণের আয়োজন করে। ম্রোদের কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। ধর্মগ্রন্থ না থাকা এবং গো হত্যা উত্সব প্রচলনের ব্যাপারে একটি চমত্কার কাহিনি প্রচলিত আছে মুরং সমাজে—

একবার সৃষ্টিকর্তা তুরাই সকল ধর্ম উপাসকদের ডাকলেন। সকল ধর্মের ধর্মগুরুরা এসে তুরাই-এর হাত থেকে তাদের ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গেলেন। শেষে দেখা গেল, তুরাই-এর হাতে ম্রো ধর্মগ্রন্থটি তখনো রয়ে গেছে। সৃষ্টিকর্তা তুরাই অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে, কারো সারা না পেয়ে সেখানে উপস্থিত একটি গরুকে দায়িত্ব দিলেন মুরং সম্প্রদায়ের প্রধানের কাছে কলাপাতায় লেখা ধর্মগ্রন্থটি পৌঁছে দিতে। কলাপাতার গ্রন্থ নিয়ে রওনা দিয়ে, পথে গরুর ঘুম পেয়ে গেল। পাহাড়ি পথে পাতার গ্রন্থ মাথায় দিয়ে ঘুমাল সে, ঘুম থেকে উঠে তার প্রচণ্ড খিদে পেলো। খিদের জ্বালায় গরু কলাপাতার সবুজ ধর্মগ্রন্থ খেয়ে ফেলল। মুরং জাতি প্রধান তুরাইয়ের দরবারে ধর্মগ্রন্থ আনতে গেলে তুরাই ঘটনা জানাল। তুরাই শাস্তিস্বরূপ গরুকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারার আদেশ দিল। সেই থেকে মুরংরা সাতক্লংপাই বা গো হত্যা অনুষ্ঠান করে থাকে। তারা মনে করে এভাবে একদিন তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ ফিরে পাবে।