পতেঙ্গাস্থ দেশের প্রধান তেল স্থাপনাসমূহে অগ্নি নিরাপত্তার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি, বিপিসির পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এবং বেসরকারি কয়েকটি ভোজ্যতেল কোম্পানির স্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফায়ার ফাইটিং ইকুইপমেন্টও নেই বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও ওই সকল তেল কোম্পানি সংশ্লিষ্টরা। ফলে দীর্ঘকাল ধরে দেশের প্রধান এ তেল স্থাপনাসমূহ এক প্রকার অরক্ষিত অবস্থায় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অথচ এ সকল স্থাপনা উচ্চ দাহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন অগ্নি দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘কি পয়েন্ট ইন্সটলেশন’ বা কেপিআই (জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) এলাকা হিসেবে বিবেচিত।
তৈলাক্ত পদার্থ থাকায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়ে তেলের স্থাপনাসমূহে ব্যাপক অগ্নি বিস্তারের মাধ্যমে সম্পদ ও প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। একইভাবে জাহাজ থেকে তেল সংগ্রহের সময়ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণেও অগ্নিকাণ্ড ও মারাত্মক বিস্ফোরণের আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এসব স্থাপনা রক্ষায় গড়ে ওঠেনি স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। আবার তেল স্থাপনাসমূহ কেপিআই হওয়া সত্ত্বেও এর সংলগ্ন এলাকা দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে সর্বসাধারণের যানবাহনসহ জনগণের চলাচল উন্মুক্ত হওয়ায় পরিকল্পিত নাশকতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রীয় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে পতেঙ্গায় সমন্বিত ফায়ার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তা মাঝপথে থেমে গেছে। মূলত প্রয়োজনীয় জমি না পাওয়ার কারণেই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে বিপিসি সূত্রে দাবি করা হয়েছে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অগ্নিনির্বাপণের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফোম টেন্ডার ও পানির ব্যবস্থা রয়েছে। আবার কোনো কোনো তেল স্থাপনায় ফিক্সড ইন্সটলেশন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। মেঘনা অয়েল কোম্পানির ডিজিএম (অপারেশন) মতলুব আহমদ জানান, তাদের সকল তেল স্থাপনায় পর্যায়ক্রমে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু ফায়ার ইকুপইমেন্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় একার পক্ষে পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইন্সটলেশন সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সূত্র জানায়, তেল স্থাপনাসমূহে স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট স্থাপন। ট্রলি মাউন্ডেট ফোম এবং ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার এক্সটিংগুইসার স্থাপন। বহনযোগ্য ফোম ফায়ার এক্সটিংগুইসারও দরকার। স্থাপনার অভ্যন্তরে বৈদ্যুতিক কন্ট্রোল প্যানেল সুইচ বোর্ড, জয়েন্ট বোর্ড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ফায়ার এক্সটিংগুইসার স্থাপন জরুরি। এছাড়া প্রতি ৩০ ফুট দূরত্বে একটি করে ৯ মিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ফোম ফায়ার এক্সটিংগুইসার স্থাপন করতে হবে। অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ের এ সকল সরঞ্জাম থাকা জরুরি হলেও বর্তমানে তেল স্থাপনাসমূহে খুবই নগণ্য সংখ্যক সরঞ্জাম রয়েছে।
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. ইয়াহিয়া জানান, তেল স্থাপনাসমূহের নিজস্ব কিছু ফায়ার ফাইটিং সামগ্রী রয়েছে। কিন্তু দক্ষ জনবল এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে বিপিসির পক্ষ থেকে সমন্বিত ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য আবেদন করলে সার্ভে করে একটি রিপোর্ট বিপিসিকে দেয়া হয়। সে সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক সরেজমিনে স্থাপনাসমূহ পরিদর্শনও করেন।
জানা গেছে, গত বছরের ৩ ডিসেম্বর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত এক পত্রে সমন্বিত ফায়ার স্টেশন স্থাপনা সংক্রান্ত এক প্রস্তাবনা বিপিসির চেয়ারম্যানের নিকট পাঠানো হয়। এতে ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য ২৩ দফা সুপারিশমালাসহ ১৮টি সরঞ্জামের তালিকা ও সম্ভাব্য ব্যয়ও বিপিসিকে জানানো হয়। সরঞ্জামাদির মধ্যে রয়েছে: ফায়ার ফাইটিং গাড়ি, ল্যাডার গাড়ি, পানিবাহী গাড়ি, জরুরি ফায়ার ফাইটিং গাড়ি, লাইট ইউনিট, ফায়ার ফ্লোট, টোয়িং গাড়ি, ফায়ার ফাইটিং পাইপ, কেমিক্যাল স্যুট, ফায়ারম্যান স্যুট, হিট প্রটেক্টর স্যুট, ফোম মেক্সি ব্রাঞ্চ পাইপ ইত্যাদি। এর জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫২ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
বিপিসি সূত্র জানায়, সম্প্রতি সংস্থার তেল স্থাপনা সংলগ্ন টিএসপি এবং সিমেন্ট ক্লিংকারের মাঝামাঝি স্থানে ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এজন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ২ একর জমিও চাওয়া হয়। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বিপিসিকে ফায়ার স্টেশন নির্মাণের জন্য জমি দেয়ার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করা হয়েছে। বন্দর থেকে বলা হয়, ওই স্থানে তাদের নিজস্ব স্থাপনা নির্মিত হবে। পত্রে বলা হয়, বিপিসিকে ইতিপূর্বে ইজারা দেয়া জমিতে তেল স্থাপনার অভ্যন্তরে অবস্থিত বাংলো ও আবাসিক এলাকা সরিয়ে নিলে ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করা যেতে পারে। এছাড়া জমি পেতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করারও পরামর্শ দেয়া হয় বিপিসিকে।
বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বিপিসির জেনারেল ম্যানেজার (প্ল্যানিং) কুদরাত-ই-এলাহী জানান, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই প্রয়োজনের কারণেই তেল স্থাপনা এলাকায় বাসা-স্থাপনা তৈরি করেছেন। বিপিসির পক্ষ থেকে বন্দরকে এই পরামর্শপত্রের জবাব দেয়া হবে বলে তিনি জানান।