ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী অভিযুক্ত সব পুলিশ ক্লোজ

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় পুলিশের গুলিতে তিন জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার মানুষ। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বিরাজ করছে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের খামখেয়ালীর কারণেই ঝরে গেল তিনটি প্রাণ। তাছাড়া স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উদাসীনতাকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, নেতাদের রাজনীতির কারণেই এই প্রাণহানি। এদিকে ঘটনা তদন্তে গতকাল শনিবার পুলিশ সদর দফতর ও জেলা প্রশাসন পৃথক দুটি কমিটি গঠন করেছে। ঘটনাস্থলে দায়িত্বে থাকা তিনজন সাব ইন্সপেক্টর ও চার জন কনস্টেবলকে তাত্ক্ষণিক ক্লোজ করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধেই গুলি করার অভিযোগ করেছেন এলাকার মানুষ।

 
গতকাল শনিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনার সময় দায়িত্ব পালন করা সব পুলিশ সদস্যকে আমি ক্লোজ করার নির্দেশ দিয়েছি।’ যারা এলাকাবাসীর উপর গুলি ছুঁড়েছে তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। আপাতত তারা ক্লোজ।’ তিনি আরো বলেন, ‘কেন, কী কারণে এই ঘটনা ঘটল, কেনই বা গুলি করার প্রয়োজন হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যারা দোষী হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
 
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমানও গতকাল বলেছেন, ‘গুলি করার যৌক্তিকতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য স্থানীয় পুলিশকে পরামর্শ দিয়েছেন।
 
তদন্ত কমিটি:ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশের ভারপ্রাপ্ত আইজি মো. মোখলেছুর রহমানের নির্দেশে অতিরিক্ত ডিআইজি (ডিসিপ্লিন) মো. আলমগীর আলমকে সভাপতি করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবারের ঘটনার পর পুলিশ ১০/১২ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে গেলেও গতকাল সকালে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
 
এদিকে নিহত শামীম (৩২), ফারুক (৩৫) ও শ্যামল দাসের (১৫) ময়না তদন্ত শনিবার টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হয়েছে। ওই হাসপাতালের আবাসিক চিকিত্সা কর্মকর্তা মো. আশরাফ আলী বলেছেন, তিনজনই বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ময়না তদন্ত শেষে দুপুরে কালিয়া গ্রামে শামীম, কুষ্টিয়া গ্রামে ফারুক ও সালেঙ্কা গ্রামে শ্যামল দাসের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকালই তিনজনের লাশের দাফন ও সত্কার করা হয়।
 
নিহতদের পরিবারে শোক: নিহতদের পরিবারে এখন চলছে কান্না আর আহাজারি। শামীমের মা আমেনা খাতুন বলেন, জুমার নামাজ পড়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় শামীম। আর ফিরে আসেনি। ঈদের পর শামীমের সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে তো মিটিং-মিছিলে যায়নি। তবে কেন তাকে পুলিশ গুলি করল? আমি বিচার চাই।’ স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ শামীমের স্ত্রী বিথী। দুই সন্তান বাদল (৮) ও মীমকে (২) নিয়ে দিশেহারা তিনি। দোষীদের শাস্তি দাবি করে শামীমের প্রতিবেশীরা বলছেন, শামীম সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন।
 
কুষ্টিয়া গ্রামে ফারুকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী ছেলে আসিফকে (৮) নিয়ে কান্নাকাটি করছেন স্ত্রী আসিয়া বেগম। পাশেই বসে আছে তাদের মেয়ে ফাতেমা (৩)। প্রতিবেশীরা জানান, মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ফারুকের সংসার। তিনি ভ্যান চালাতেন। একই  অবস্থা নিহত শ্যামল দাসের সালেঙ্কা গ্রামের বাড়িতেও। একটি সেলুনে কাজ করত সে। তিন ভাইয়ের মধ্যে শ্যামল ছিল সবার বড়। সন্তান হারিয়ে কাঠমিস্ত্রি বাবা রবি দাস পাগলপ্রায়, মা ভারতী রানী বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন জানান, নিহতদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। আহতদের চিকিত্সার খরচ দেবে জেলা প্রশাসন।
 

থমথমে কালিহাতী: গতকাল কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড ও পাশের হামিদপুর বাজার এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে,  সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কেউই খোলাসা করে কথা বলছেন না। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া র্যাব ও আর্মড পুলিশ এলাকায় টহল দিচ্ছে। হামিদপুর বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় টাঙ্গাইল সদর সার্কেলের এএসপি হাফিজ আল আসাদের সাথে। তিনি বলেন, যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অন্তত ৭০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ঘাটাইল ও কালিহাতী থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান। এই পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেন, শুক্রবার বিকালে পুলিশ নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে। কালিহাতী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশের ওপর হামলা ও কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।