বিদেশি চক্রের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ

গুলশান কূটনৈতিক পাড়ায় ইতালীয় নাগরিক চেজার তাভেল্লা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোন বিদেশি চক্রের যোগসূত্র আছে কি-না তা তদন্ত করে দেখছেন গোয়েন্দারা। কারণ অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর বিলম্বিত ঘোষণার পরেই এই বিদেশি নাগরিক খুনের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখতেই কোন গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ হত্যাকাণ্ডে উগ্র মৌলবাদী বা জঙ্গি গোষ্ঠীর জড়িত থাকাও বিচিত্র নয়। তাছাড়া যে এনজিওতে তাভেল্লা কাজ করতেন সেটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের সূত্রধরে তিনি খুন হয়েছেন কি না সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 
হত্যাকাণ্ডে সরাসরি তিন জনের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। যদিও গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি। হত্যার পর খুনিরা মোটরসাইকেলযোগে ৮৯ নম্বর সড়ক দিয়ে পালিয়ে যায়। এদিকে হত্যার দায় স্বীকার করে আইএস-এর তরফ থেকে যে বিবৃতি এসেছে তার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শুধু বাংলাদেশ নয়, ইতালীও মনে করে, হত্যাকাণ্ডে আইএস জড়িত নয়। এর পেছনে অন্য কিছু থাকতে পারে।
 
গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এমনটাই জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তার সঙ্গে ডিবি পূর্ব বিভাগের উপ-কমিশনার মাহবুব আলম ও গুলশানের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল আহাদ উপস্থিত ছিলেন। মনিরুল ইসলাম জানান, তাভেল্লার পেশাগত কোন ঝামেলা ছিল কি-না তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তৃতীয় কোন পক্ষ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। হত্যার বিষয়ে আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, তারও পর্যালোচনা চলছে।
 
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ৯০ নম্বর সড়কের পাশে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক এনজিও আইসিসিও কো-অপারেশন বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক চেজার তাভেল্লা (৫০)। তিনি আইসিসিও কো-অপারেশনের ‘প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি’ কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। এনজিওটি বাংলাদেশে পানি, সেনিটেশন, শরণার্থী সমস্যা ও পুনর্বাসনসহ নানা সমাজসেবামূলক কাজ করে থাকে।
 
তদন্তকারী সংস্থা বলছে, ঘটনার পর আশপাশের প্রায় সব দূতাবাসসহ সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফুটেজ পর্যালোচনা করে হত্যাকারীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডে একটি মোটরসাইকেলযোগে তিন খুনি অংশ নেয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। 
 
তদন্তকারীরা বলছেন, তাভেল্লার এনজিওটির অফিস গুলশান-১ এর ৩০ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায়। আর তিনি গুলশান-২ নম্বরের ৫৪ নম্বর সড়কের ১১/বি নম্বর বাড়ির ৫/২ ফ্যাটে বসবাস করছিলেন। ২৫ বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এনজিওতে কাজ করেছেন তিনি। অন্তত ১০টি দেশে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে ২০১২ সাল থেকে কার্যক্রম চালালেও ২০১৩ সালে এনজিওটি বাংলাদেশের এনজিও ব্যুরোর তালিকাভুক্ত হয়। চলতি বছরের ১৫ মে তাভেল্লা মাসিক প্রায় ৯ লাখ টাকা বেতনে এনজিওটির বাংলাদেশ শাখায় যোগদান করেন। যোগদানের পর প্রায় ২৫ দিন তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন না।
 

সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে তদন্তকারীরা বলছেন, তাভেল্লার গতিবিধি আগ থেকেই নজরদারির মধ্যে রেখেছিল খুনিরা। এরপর সুযোগ বুঝে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। এদিকে এনজিওটির যেসব কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তাতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটার মত কোন আলামত বা আর্থিক লেনদেনের ফিরিস্তি মেলেনি। ইতিমধ্যে এনজিওটির ৬৬ জন সর্ম্পকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের তথ্য যাচাই বাছাই করেও তাভেল্লা হত্যার মত কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গুলশানের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল আহাদ জানান, তাভেল্লার লাশ এখনও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরেই রয়েছে। লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি বাংলাদেশস্থ ইতালীয় দূতাবাসের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। ইতালীর মিলান শহরে বসবাসরত ১৬ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ের কাছেই তাভেল্লার লাশ হস্তান্তরের কথা রয়েছে।