জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবে পরিবর্তনের আভাস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা চার বছর চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ইরানের পরমাণু উচ্চাভিলাষ ঠেকাতে পেরেছেন। তিনি এটি করেছেন কারণ, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে ইরানে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়াটা প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।

 
পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার জন্য ইরানকে আলোচনার মাধ্যমে রাজি করাতে যুক্তরাষ্ট্রকে যতটা তত্পর হতে দেখা গেছে, অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুতে ততটা সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখা ও মানুষের ভবিষ্যত্ অস্তিত্ব নিরাপদ রাখতে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। অথচ অদূর ভবিষ্যতে গ্রিন হাউস গ্যাস নিগর্মন কমবে এমন কোন দৃশ্যমান উদ্যোগই চোখে পড়ছে না। জলবায়ু পরিবর্তন বা ভূমণ্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য বাতাসে গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দায়ী বলে ধরা হয়। যে দেশগুলো এখনও পর্যন্ত এ গ্যাসটি বেশিমাত্রায় নিঃসরণ ঘটাচ্ছে তারা এর পরিমাণ কমিয়ে আনার কোন দৃঢ় প্রতিশ্রুতি এখনও দেয়নি।
 
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এখনও পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৃহীত একমাত্র উদ্যোগ হলো জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘ কাঠামো চুক্তিটি (ইউএনএফসিসিসি)। সমস্যাটি যৌথভাবে মোকাবেলার এটি একমাত্র আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। সামান্য কিছু সফলতা ছাড়া চুক্তিটি বড় কোন অর্জন আনতে পারেনি। বরং গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
 
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণীমহল বিষয়টি নিয়ে কখনোই খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে অগ্রসর হয়নি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ বা অন্যান্য যুদ্ধ অবসানের জন্য তারা যে রকম তত্পরতা দেখিয়েছেন এ ব্যাপারে তেমন কিছু তারা করেননি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি অবশ্য এ বিষয়ে কাজ করার জন্য তার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি তেমন গা করেনি। শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা যেন জলবায়ু ইস্যুতে নিরুত্সাহিতই বোধ করেন। তারা আশঙ্কা করেন গ্রিন হাউস নির্গমন কমালে কর্মক্ষেত্র কিছুটা হলেও সঙ্কুচিত হবে, বাড়বে বেকারত্বের হার। এগুলো আবার নেতিবাচক গিয়ে পড়ে রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের ওপর।     মার্কিনীরা নিজেদের সবচেয়ে পরিবেশ সচেতন হিসেবে পরিচয় দিতে গৌরব বোধ করলেও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে বেশি আগ্রহ দেখায় না। তবে হালে ওবামা যেন ইস্যুটিতে নড়েচড়ে বসেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তিনি এবার কিছু পরিবর্তন আনবেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ লোকদের তিনি এ নিয়ে কাজে নেমে যেতে বলবেন। যেমন কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নিলে সবচেয়ে দক্ষ কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের তিনি ওই প্রস্তুতিমূলক কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এবার জলবায়ু ইস্যুতেও তিনি একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
 

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র এটি সবার কাছে তুলে ধরতে হবে যে জলবায় পরিবর্তন ইস্যুটি এখন আর কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এ নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে হতাশা রয়েছে তার অবসান ঘটানো প্রয়োজন। মানুষ ধরেই নিয়েছে জলবায়ু ইস্যুতে কেবল কথাই হয় কাজের কাজ কিছুই হয় না। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, কার্বন নির্গমন সম্পূর্ণ কমিয়ে আনতে না পারলেও যেসব দেশ এটি বেশি নির্গমন করছে সেসব দেশ যদি কিছুটা কমিয়ে আনতে পারে তবে এর সুফল বিশ্ববাসী পাবে। দু’মাস আগে এক সাক্ষাত্কারে ওবামা বলেছিলেন, ‘সবাই মনে করে ইরানের পরমাণু ইস্যুটি আমাদের কাছে এই মুহূর্তে প্রধান সমস্যা। অন্য সমস্যাগুলোকে হয়তো আমরা সেভাবে বিবেচনায় নেইনি। বাস্তবতা হলো, আগের কাজটি আগে করতে হবে।’ জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু যে ওবামার এজেন্ডা থেকে একেবারে মুছে ফেলা হয়নি এর মধ্য দিয়ে তিনি সম্ভবত সে বার্তাটিই দিয়েছেন।