আগামীকাল বৃহস্পতিবার পয়লা মহররম। শুরু হলো আরবি নববর্ষ। হিজরী ১৪৩৭। বুধবার বাংলাদেশের আকাশে মহররম মাসের চাঁদ দেখা গেছে। ফলে আগামী ১০ মহররম ২৪ অক্টোবর শনিবার পবিত্র আশুরা পালিত হবে।
বায়তুল মুকাররমে মসজিদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে সন্ধ্যায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ধর্ম সচিব ও চাঁদ দেখা কমিটির সদস্য চৌধুরী মো. বাবুল হাসান। আশুরার দিন সরকারি ছুটি পালিত হবে।
আরবী মাস সমূহের মধ্যে এই মহররম বড়ই তাত্পর্যপূর্ণ। ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা। ৬১ হিজরি সালের এই দিনে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া ছাল্লামের প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে কারবালার ময়দানে শহীদ হন। পবিত্র আশুরা তাই মুসলিম উম্মাহর জন্য এক তাত্পর্যময় ও শোকাবহ দিন। দিনটি মুসলমানদের কাছে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠারও দিন। পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কেয়ামত পর্যন্ত অসংখ্য ঘটনার দিন। শুধু মুসলমান নয় সকল মানুষের কাছে দিনটি স্মরণীয়। ইতিহাসে বিশাল জায়গা দখল করে আছে পবিত্র আশুরা দিবস। এই আশুরা ইসলামের ইতিহাসে এক অসামান্য তাত্পর্যে উজ্জল। ইবাদত-বন্দেগীর জন্যও এ দিবস অতুলনীয়। এ দিনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে খুবই প্রিয়। তাই তিনি এ দিনে রোযা পালনের সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে। বিগত বছরের গোনাহ এর কাফফারা হিসাবে মহররমের দুটি রোজা রাখা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এই আশুরা ইতিহাসে বিশাল জায়গা দখল করে আছে। মহান আল্লাহ তায়ালা এ দিনেই আরশ, কুরছি, লওহ, কলম আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং এ দিনেই আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করে তাকে বেহেশতে স্থান দিয়েছেন। পরবর্তীতে শয়তানের প্ররোচনায় ভুলের কারণে এ দিনেই তাঁকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে আল্লাহ প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। হযরত নূহ (আঃ) সাড়ে নয়শত বছর ধরে তাওহীদের বাণী প্রচারের পর যখন সে যুগের মানুষ আল্লাহর বিধি নিষেধ পালনে অস্বীকৃতি জানায়, তখন নেমে আসে আল্লাহর গজব। ফলে হযরত নূহ (আঃ) এর সমপ্রদায় ধ্বংস হয়েছে। শুধু রক্ষা পেয়েছে তাওহীদে বিশ্বাসী নূহ (আঃ) এর অনুসারীবৃন্দ। পবিত্র আশুরার দিনে মহাপ্লাবনের সময় হযরত নূহ (আঃ) এর নৌকা তার অনুসারীদের নিয়ে জুদি পাহাড়ের পাদদেশে এসে থেমেছিল। আজো তার কিছু নিদর্শন সেখানে পাওয়া যায়। পবিত্র আশুরার দিনেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ) শত বিধি নিষেধের মধ্য দিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে উদ্ধার লাভ করেন এবং নিজের প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে আল্লাহর নামে জবেহ করতে উদ্যত হলে খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধু হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিলেন পবিত্র আশুরার দিনে। এদিনেই হযরত আইউব (আঃ) কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, হযরত ঈসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কাফেরদের ষড়যন্ত্রের শিকার হলে আল্লাহ তাকে চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেন। এদিনেই হযরত দাউদ (আঃ) আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা লাভ করেছিলেন, হযরত সোলেমান (আঃ) তাঁর হারানো রাজত্ব পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছিলেন, হযরত ইউনুস (আঃ) মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন, হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর হারানো পুত্র হযরত ইউসূফ (আঃ)কে চল্লিশ বছর পর ফিরে পেয়েছিলেন। পবিত্র আশুরার দিনে ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া শিশু মুসাকে গ্রহণ করেছিলেন। আবার স্বীয় কওমের লোকজনসহ হযরত মূসা (আঃ) নীল নদ অতিক্রম করে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি লাভ করেন। পক্ষান্তরে ফেরাউন সদলবলে নীল নদে ডুবে মারা যায়। পবিত্র আশুরা সমগ্র জগত্ সৃষ্টির দিন হিসেবে যেমনি স্বীকৃত তেমনি এদিন কেয়ামত অনুষ্ঠিত হয়ে জগত্ ধ্বংস প্রাপ্ত হবে। এদিনে এমনি আরো বহু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং আরো হবে। এই পৃথিবীর মহাপ্রলয় বা কিয়ামত মহররমের ১০ তারিখে ঘটবে বলে বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে হিজরি সনের সম্পর্ক চাঁদের সঙ্গে। এ জন্য এটাকে চন্দ বর্ষও বলা হয়। যেহেতু চাঁদ দেখার সঙ্গে হিজরি মাসের সম্পর্ক এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইবাদতের সময় সরকারিভাবে চাঁদ দেখার ঘোষণা দেয় নির্দিষ্ট কমিটি। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর আল্লাহর নির্দেশে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ বা ১৫ জুলাইয়ের সূর্যাস্তের সময়কে হিজরি সন শুরুর সময় হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। ১৭ হিজরি থেকে তত্কালীন মুসলিম বিশ্বের শাসক হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে হিজরি সন গণনা শুরু হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম প্রসার লাভ করে, মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, মুসলিমদের শক্তিমত্তা বাড়তে থাকে ও ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। মদিনায় তিনি ইসলামী রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। হিজরতের ঘটনাকে স্মরণ করে বানানো হয়েছে বলে এ সনকে হিজরি সন বলা হয়।