দোতারার সুরে জেগে উঠেছে ছেঁউড়িয়া

মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের স্মরণানুষ্ঠান উপলক্ষে কুষ্টিয়া এখন বাউলদের পদচারণায় মুখরিত। সবার গন্তব্য কুমারখালী উপজেলার ছেঁউরিয়া গ্রাম। সেখানেই লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি। এই আখড়াবাড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এখন দলে দলে মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন ছেঁউরিয়ায়। দোতারার সুরে সুরে যেন জেগে উঠেছে লালনের স্মৃতিবিজড়িত আখড়াবাড়ি।

 
আজ পহেলা কার্তিক। মহামতি ফকির লালন সাঁইয়ের ১২৫তম তিরোধান দিবস।  এ উপলক্ষে ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়িতে আজ থেকে শুরু হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সব। এবার উত্সবের শিরোনাম করা হয়েছে ‘অনুরাগ নইলে কি সাধন হয়.....।’ দেশের নানা প্রান্ত থেকে কয়েকদিন আগে থেকেই স্মরণোত্সবে যোগ দিতে ছেঁউড়িয়ায় সমবেত হয়েছেন লালন ভক্ত-অনুসারীরা। মহামতি ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করার পর তার ভক্ত-অনুসারীরা প্রতি বছর পহেলা কার্তিক এই উত্সব পালন করে থাকেন। প্রসঙ্গত, ছেঁউড়িয়ায় সাঁইজির ধামে প্রতিবছর দুইটি উত্সব উদযাপন হয়। একটি মার্চ মাসে দোল উত্সব, অপরটি পহেলা কার্তিক বা ১৬ অক্টোবর সাঁইজির তিরোধান দিবস। দুটি উত্সবই পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়।
 
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আখড়ায় গিয়ে দেখা মিললো বাউলদের। যারা সারাজীবন উত্সর্গ করেছেন লালনের দর্শনের সন্ধানে। এসব বাউলের কেউ কেউ এসেছেন দল বেঁধে, আবার কেউ এসেছেন একাই। তাদের এই আসার জন্য ছিলো না কোনো দাওয়াত পত্র, না ছিলো নিমন্ত্রণ। তবু ছুটে আসা। স্মরণোত্সবে প্রতিবছরের মতো এবারো সাধক লালনের আধ্যাত্মিক দর্শন লাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ প্রাণের টানে ছুটে এসেছেন আখড়ায়। একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে লালনভূমি ছেঁউড়িয়া। উত্সব শুরুর আগেই লালন ভক্ত ও বাউলদের খণ্ড খণ্ড গানের আসর বসে গেছে। বাউলরা দরদভরা কণ্ঠে গাইছেন লালনের রেখে যাওয়া সব আধ্যাত্মিক গান।
 
লালন আখড়া বাড়ির উন্মুক্ত চত্বরে লালন একাডেমির আয়োজনে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, লালন মেলা ও লালন সংগীতানুষ্ঠান। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আনুষ্ঠানিকভাবে লালন স্মরণোত্সব উদ্বোধন করবেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ। লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম হক ইত্তেফাককে জানান, প্রতিবারের মতো এবারও সাধুভক্তদের জন্য সকল সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশ থেকে লালনভক্তরা আসতে শুরু করেছেন। অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
 

সরজমিনে দেখা গেছে, মরা কালি নদীর পাড়ে মূল মঞ্চের সামনের মাঠে দর্শকদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে প্যান্ডেল। প্রতিবছরের মত এবারও অনুষ্ঠানকে দুই পর্বে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রথম পর্বের অনুষ্ঠানে থাকবে ফকির লালনের জীবনী ও দর্শন নিয়ে আলোচনা সভা এবং দ্বিতীয় পর্বে শুরু হবে লালনগীতির আসর। আগামী ২০ অক্টোবর শেষ হবে এই স্মরণোত্সব। লালন ভক্তদের মতে, ১১৬ বছর বয়সে বাংলা ১২৯৭ ও ইংরেজি ১৮৯০ সালে ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন।  সেই থেকে লালন ভক্তরা এই স্মরণোত্সবের আয়োজন করে আসছেন।