দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পর বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় জেলা পুলিশ গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পুলিশের বিশেষ শাখা নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের তালিকা তৈরিতে এবার মাঠে নেমেছে।
গার্মেন্টস শিল্পে প্রকৃত পক্ষে কতজন বিদেশি নাগরিক কর্মরত রয়েছে এ তালিকা পুলিশ কিংবা বিকেএমইএ কারো কাছেই এতদিন ছিল না। এ সম্পর্কে ইত্তেফাকে সংবাদ প্রকাশের পর পুলিশের নির্দেশে এ তালিকা তৈরি করছে গার্মেন্টস মালিকারা। বিদেশি নাগরিকদের বাড়তি নিরাপত্তা দিতে এমন তালিকা তৈরি হচ্ছে বলে গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ ও প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, ইতালির নাগরিক তাভেল্লা সিজার ও জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের বাড়তি নিরাপত্তার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। তারই ধারাবাহিকতায় এবার পোশাক খাতে কর্মরত বিদেশিদের নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশে পোশাক শিল্পে কর্মরত বিদেশিদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহের এ কাজ করছে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এবং বিজেএমইএ।
সূত্র জানায়, কারিগরি ভাবে দক্ষ কর্মী ঘাটতির কারণেই পোশাক শিল্পে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি কাজ করছেন। যাদের বেশির ভাগই নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত বিভিন্ন গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করছেন। যারা কাজের তাগিদে প্রতিদিন ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে যাতায়াত করেন। অনেকে বাস করেন শিল্পাঞ্চলগুলোর আশপাশের এলাকায়। তাই কারখানা ও আবাসস্থল দুই ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে তাদের তালিকা তৈরি করছে বিজেএমইএ। এ ছাড়া ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে রূপায়ন সিটিতে গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত অনেক বিদেশি বসবাস করে।
বিকেএমইএ'র একটি সূত্র জানায়, দেশে কর্মরত ও বসবাসরত সব বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানে যেসব বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, তাদেরও হালনাগাদ তথ্য সংবলিত দলিলাদি বিকেএমইএতে পাঠাতে হবে। হার্ড ও সফট দুই পন্থায়ই তথ্য জানাতে হবে সংগঠনকে।
বিকেএমইএর একজন কর্মকর্তা জানান, পুলিশের নির্দেশেই পোশাক শিল্পে কর্মরত বিদেশিদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। এ শিল্পের অনেক কারখানায় কারিগরি ভাবে দক্ষ বিদেশি নাগরিক কর্মরত আছেন। কারখানায় কাজ করলেও তাদের আবাসস্থল ভিন্ন। দুই স্থানেই যেন নিরাপত্তা জোরদার করা যায়, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট ছকে সদস্য কারখানার কাছে কর্মরত বিদেশিদের তথ্য চেয়েছে বিকেএমএই। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে তাদের নাম-ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বর, নাগরিকত্ব, সেলফোন নম্বর, আবাসিক ঠিকানা, কর্মরত প্রতিষ্ঠানের নাম ও বাংলাদেশে আগমনের তারিখ।
কারিগরি ভাবে দক্ষ বিদেশি নাগরিকরা বস্ত্র ও পোশাক, ওষুধ, চামড়া জাত পণ্য, খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও তথ্যপ্রযুক্তি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মরত বস্ত্র ও পোশাক খাতে। এসব নাগরিকের বেশির ভাগ ভারতীয়। পাশাপাশি কোরিয়া, জাপান ও শ্রীলংকার নাগরিকও রয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শিল্প ছাড়াও সিমেন্ট কারখানা ও শিশু খাদ্য কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বহু বিদেশী নাগরিক কাজ করছে।
এদিকে দেশের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশে কার্যালয় রয়েছে, এমন ৭০-৮০টি পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বিদেশি ক্রেতারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তাদের একটি নির্ধারিত বৈঠকও বাতিল করেছেন বাংলাদেশে বসবাসরত ক্রেতা প্রতিনিধিরা।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, পোশাক শিল্পসহ নারায়ণগঞ্জে কর্মরত সকল বিদেশীদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক বিদেশীই কিংবা তাদের প্রতিষ্ঠানের মালিকরা আমাদেরকে সঠিক তথ্য না দেওয়ায় আমাদের দায়িত্ব পালনে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়।