"জ্ঞানের বাতিঘর" সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার

২ লাখেরও বেশি বইয়ের সংগ্রহ Åইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগে নতুন মাত্রা Å২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি

 
১৯৫৮ সালে ১০ হাজার ৪০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু। এখন বইয়ের সংগ্রহ দুই লাখেরও বেশি। জ্ঞানের কাঠামোবদ্ধ সংরক্ষণ এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সেই জ্ঞানের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ একইধারায় নিশ্চিত করছে এই গ্রন্থাগার। ই-বুক বা ডিজিটাল বইয়ের দাপটের এই সময়েও বিপুলসংখ্যক গবেষক ও পাঠক এতে ভিড় করেন। রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহত্ গণগ্রন্থাগার সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের আবেদন এমনই।
 
তবে পাঠকরা এও মনে করছেন, গ্রন্থাগারটির ব্যবস্থাপনায় আরও আধুনিকায়ন দরকার। একইসঙ্গে গ্রন্থাগারের সম্পদ সুষ্ঠু ব্যবহারে পাঠকদের মধ্যে যত্নশীল  হওয়া, সচেতনতা ও আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
 
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৫ সালের ১০ মে তত্কালীন সরকারের শিক্ষা বিভাগের ১৪৯১-শিক্ষা সংখ্যক আদেশ বলে ‘সোশ্যাল আপলিফট’ প্রকল্পের অধীনে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক মঞ্জুরি প্রদান করা হয়। ১৯৫৮ সালের ২২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গ্রন্থাগারটির উদ্বোধন করা হয়। ১৯৭৭ সালে গ্রন্থাগারটিকে শাহবাগ এলাকায় বর্তমান স্থানে নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তর করা হয়। পরের বছর ৬ জানুয়ারি নতুন ভবনে গ্রন্থাগারটি উদ্বোধন করা হয়। ভবনটির আয়তন ৬২ হাজার ৩০০ বর্গফুট।
 
গণগ্রন্থাগারের মহাপরিচালক আশীষ কুমার সরকার বলেন, সুফিয়া কামাল জাতীয় গ্রন্থাগার দেশের গণগ্রন্থাগার ব্যবস্থার মূল প্রতিষ্ঠান  হিসেবে কাজ করছে। সরকারি ও বেসরকারি গণগ্রন্থাগারগুলোর অগ্রপথিক এটি। অধিকতর পাঠকবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এর সেবার পরিধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
 
জাতীয় গণগ্রন্থাগারের পাঁচটি পাঠকক্ষ রয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে-সাধারণ পাঠকক্ষ, বিজ্ঞান ও রেফারেন্স পাঠকক্ষ, শিশু পাঠকক্ষ। সাধারণ পাঠকক্ষ রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শিশু পাঠকক্ষ সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বিজ্ঞান ও রেফারেন্স পাঠকক্ষ প্রতি শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এই সময়সীমায় গ্রন্থাগারটি থেকে পাঠক সেবা, রেফারেন্স সেবা, সাম্প্রতিক তথ্য জ্ঞাপন, পরামর্শ, নির্বাচিত তথ্য বিতরণ, পুস্তক লেনদেন, ফটোকপি, পুরাতন পত্রিকা প্রদর্শন সেবা পাওয়া যায়। এছাড়াও ফ্রি ইন্টারনেট সেবাও রয়েছে। সব বয়স, পেশা ও শ্রেণীর মানুষ এ সেবাগুলো পেতে পারেন।
 
গ্রন্থাগার সূত্র জানায়, জাতীয় এ গণগ্রন্থাগারটিতে দুই লাখ দুই হাজার ১৮৩টি বই রয়েছে। ২০০৭ সালের হিসাব মতে, এতে দুর্লভ ও ঐতিহাসিকভাবে মূল্যবান ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৫০টি বই আছে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বইয়ের আধিক্য থাকলেও আরবি, হিন্দি, উর্দু ও ফারসি ভাষারও কিছু বই রয়েছে। এছাড়া পুরনো পত্রিকার আর্কাইভ ও সাম্প্রতিক পত্রিকার সুবিন্যস্ত সংরক্ষণ পাঠকের দারুণ আগ্রহের বিষয়।
 
নামকরণ, নাম বদল 
 
২০০৪ সালে সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার (সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরি) নামকরণ করা হয়েছিল। ২০১০ সালের ২১ জানুয়ারি আবার এর আগের নামটি পুন:প্রবর্তন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এদিকে নামের ক্ষেত্রে পুরনো অবস্থানে ফিরে গেলেও গ্রন্থাগারটি ২৪ ঘন্টা খোলা রাখার পুন:সিদ্ধান্তটি এখন পর্যন্ত হয়নি। ২০০৩ সালের ২৬ জুলাই থেকে গ্রন্থাগারটি দিনরাত খোলা থাকলেও ২০০৭ সালে সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত এটি খোলা রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। অপ্রতুল জনবলের কারণ দেখিয়ে ২৪ ঘন্টা লাইব্রেরি খোলা রাখার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে তখনকার কর্তৃপক্ষ এবং পরে আবার জনবল নিয়োগ দিয়ে ২৪ ঘন্টা লাইব্রেরি খোলা রাখা হবে বলে পাঠকদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু গত আট বছরেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এ প্রসঙ্গে গ্রন্থাগারটির নিয়মিত পাঠক ও রাজধানীর একটি কলেজের শিক্ষক আবু সুফিয়ান বলেন, গোটা রাজধানীতে এই একটি গণগ্রন্থাগার। এর আশপাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় সারাদিনই ভিড় থাকে। আগে রাতে যখন লাইব্রেরিটি খোলা থাকত তখন একশ্রেণীর গবেষক-পাঠক নিবিড়চিত্তে পড়াশোনা করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের কয়েকটি গ্রুপও নিয়মিত লাইব্রেরিতে আসত। রাতে লাইব্রেরি বন্ধ রাখায় পাঠকদের একটি বড় অংশ বঞ্চিত হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব পাঠকক্ষটি ২৪ ঘন্টা খোলা রাখার দাবি জানান তিনি।
 
কাগজের বই ও ই-বুক পাশাপাশি
 
তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে মানুষের বই পড়ার অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। দ্রুত তথ্য খুঁজে বের করতে ই-বুক বা অনলাইন মাধ্যমে সংরক্ষিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ ব্যবহারের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এছাড়া যে কোনো বিষয়ে হালনাগাদ তথ্যের জন্য জিজ্ঞাসাও বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতায় জাতীয় গণগ্রন্থাগারেও সনাতনী ধরণের বইয়ের পাশাপাশি ইন্টারনেট বইয়ের চাহিদাও পাঠকের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এ চাহিদাকে সামনে রেখে সাইবার ক্যাফে ওনার্স এসোসিয়েশনের মাধ্যমে কিওস্ক স্থাপন করে চারটি কম্পিউটারে ফ্রি ইন্টারনেট সেবা দেয়া হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এটি তত্ত্বাবধান করছে। মোবাইল অপারেটর রবি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞান পাঠকক্ষে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে। এছাড়া গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ বইগুলোর ই-সংস্করণ তৈরি ও সংরক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় গণগ্রন্থাগারের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, গ্রন্থাগারের দুর্লভ বইগুলো প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই এগুলোকে ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া পাঠকদের জন্য সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টাও রয়েছে। আগের বক্স ক্যাটালগের পাশাপাশি কম্পিউটারাইজড ক্যাটালগ পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে।
 
আলোর ঘরে অন্ধকার-বিশৃঙ্খলা
 
গ্রন্থাগারটিতে বই পড়ে ও জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে অনেকে আলোকিত হলেও একশ্রেণীর পাঠকের মধ্যে বই চুরির মানসিকতা রয়েছে। পাঠাগারের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং কিছুসংখ্যক ব্যক্তির দুর্বৃত্তপণার কারণে ইতিমধ্যে পাঠকক্ষগুলো থেকে বেশ সংখ্যক বই চুরি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন গ্রন্থাগারের একাধিক কর্মী। হারিয়ে যাওয়া বইয়ের সংখ্যাও জানে না কর্তৃপক্ষ। এদিকে ক্যাটালগ অনুযায়ী বইয়ের তাকগুলোতে বই খুঁজে পাওয়া নিয়ে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে পাঠকদের। অনেক পাঠক নিজের মন মত তাকগুলোতে বই রাখেন। আবার গ্রন্থাগারের কর্মীরাও দায়িত্বে অবহেলা করে নির্দিষ্ট বইগুলো নির্ধারিত তাকগুলোতে রাখেন না। ফলে কাঙ্খিত বই পাওয়া প্রায়ই কষ্টসাধ্য ও অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে যায়।
 
বহিরাগত গাইড বই
 
পাঠকক্ষে বাইরে থেকে বই নিয়ে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ হলেও নিয়মটি পালিত হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ পড়ুয়া কিংবা উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ গ্রন্থাগারে চাকরিকেন্দ্রিক গাইড বই নিয়ে পড়াশোনা করেন। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এমন পাঠকদের সংখ্যাই বেশি বলে জানিয়েছেন গ্রন্থাগারটির কর্মীরা। চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজার এবং আবাসন অসুবিধার কথা ভেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গাইড নিয়ে পাঠকক্ষে প্রবেশের ব্যপারে শৈথিল্য দেখাচ্ছে। তবে গ্রন্থাগারে মৌলিক বই পাঠের চেয়ে গাইড বই পড়ার সংখ্যা বৃদ্ধিকে বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা।
 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, চাকরির জন্য শিক্ষার্থীরা অবশ্যই পড়বে। তবে সেটি গণগ্রন্থাগারে নয়। এ জন্য ভিন্ন কেন্দ্র খোলা যেতে পারে। আর মৌলিক বই থেকে দূরে সরে গেলে জ্ঞান অর্জনের জায়গায়ও ঘাটতি তৈরি হয়। তাই যুগের চাহিদা ও চাকরির বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য অবশ্যই মৌলিক বই পড়তে হবে। এছাড়া পাঠকক্ষে গাইড বই গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে।