বাল্যবিয়ে বন্ধে দেশব্যাপী বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনায় সরকার

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বাল্যবিবাহ বন্ধে দেশব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার। আগামী ২০১৬ সালেই এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত বাল্যবিয়ে বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি একথা জানান।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দু’টি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং পথশিশুদের পুনর্বাসন করা। এ লক্ষ্যে সরকার ২০১৬ সালে দেশের প্রত্যেক জেলায় বিস্তারিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কারণ, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতেই হবে।’

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ পরিচালিত ‘গেটিং দ্য এভিডেন্স: এশিয়া চাইল্ড ম্যারিজ ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে প্ল্যান এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম এনডিসি, বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনার বেনোইত- পিয়েরে লারামি এবং ইউএনএফপিএ প্রতিনিধি আরজেন্টিনা পিন্টো। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর সেনায়েট গেবরেগ জেভিয়ার অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘শিক্ষা ও দারিদ্রকে বাল্যবিয়ের প্রধান দু’টি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এগুলো উত্তরণে সরকার ইতোমধ্যেই উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপত্তার কারণেও অনেক সময় অভিভাবকরা বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই এসব পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশব্যাপী একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, ‘একটি বিপুল জনসংখ্যার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল নাই, সত্যি। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোতে এক মিনিট বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ থাকলে যে পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয় বাংলাদেশে একদিন বিদ্যুত সরবরাহ না থাকলেও সেই পরিমাণ অপরাধ সংঘটিত হয়না। অর্থ্যাৎ এদেশে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছেন। তাদের সাথে নিয়েই ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশ থেকে বাল্যবিয়ে নির্মূল করব এবং দেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবো।’

তিনি বাল্যবিয়ে বন্ধে ২০১৬ সালের জন্য গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের সাথে কাজ করার জন্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বাল্যবিবাহ নির্মূলে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র যেন তার প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে আমরা সেই অবস্থা দেখতে চাই। যারা শিশু নির্যাতন করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। তাদের বাবা মাকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

কানাডিয়ান হাই কমিশনার বেনোইত- পিয়েরে লারামি বাংলাদেশের সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ইয়ূথ এডভোকেসি কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, বাল্যবিবাহ নির্মূল করতে হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।

তিনি বাল্যবিয়ে বন্ধে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, ধর্মীয় গুরু এবং তৃণমূলের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কাজ করার আহ্বান জানান।

‘গেটিং দ্য এভিডেন্স: এশিয়া চাইল্ড ম্যারিজ ইনিশিয়েটিভ’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় বাল্যবিবাহের অন্তুর্নিহিত কারণ ও প্রভাবক বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এতে এই তিনটি দেশের গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের হার উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়।

এ গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় ২৭ শতাংশ মেয়ের। অন্যদিকে দেশে ২.৮ ভাগ ছেলের বাল্যবিয়ে হয়।

ইন্দোনেশিয়ায় ৩৮ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ৩.৭ শতাংশ। তিন দেশের মধ্যে পাকিস্তানে বাল্যবিয়ের হার সর্বনিম্ন। সেখানে ৩৪.৮ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে এবং ১৫.২ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে হয়ে যায়। তবে পাকিস্তানে ছেলেদের বাল্যবিয়ের হার ১৩ শতাংশ। বাসস।