সন্ত্রাসের আশ্রয়দাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করুন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, সন্ত্রাসবাদীদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করা উচিত। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নাম পরিবর্তন হয় এবং এই সমস্যাটা অনেক গভীরে। এর মোকাবিলার জন্য পুরো বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কোনো পার্থক্য তৈরি করা যাবে না। বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব কথা বলেন। পার্লামেন্টের অধিবেশন না থাকলেও প্রধানমন্ত্রী মোদীর সম্মানে বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা হয়। এদিকে গতকাল  বাকিংহাম প্রাসাদ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে স্বাগত জানান প্রাসাদে। সেখানেই মধ্যাহ্ন ভোজ সারেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজার পত্রিকার।

 
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। সৌরশক্তি ও অপ্রচলিত শক্তি ব্যবহারে ভারতের বিভিন্ন পদক্ষেপও তুলে ধরেছেন তিনি। একই সঙ্গে তার বার্তা, শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমালে চলবে না, প্রয়োজন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন। নরেন্দ্র মোদী বলেন, অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী ও আধুনিকতার রূপকার ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানেই তাদের লক্ষ্যের কথা প্রথম বুঝতে পারেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জওহরলাল নেহরু ও মনমোহন সিং।
 
ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পরিচিত মোদী জ্যাকেটে দেখা যায়নি। একেবারে স্যুট-ব্যুট পরেই রয়্যাল গ্যালারিতে প্রবেশ করেন মোদী। পার্লামেন্টের স্পিকার উদ্বোধনী বক্তব্য রাখার পরই বক্তৃতা দিতে উঠে দাঁড়ান প্রধানমন্ত্রী মোদী। এই সময় ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ দিয়ে মোদীকে অভ্যর্থনা জানান ব্রিটিশ এমপিরা। প্রধানমন্ত্রী মোদীও এমপিদের দেয়া সম্মানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে  ভোলেননি। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের অনেক ইতিহাসের সঙ্গে এই পার্লামেন্টের যোগসূত্র রয়েছে। তিনি বলেন, আমি  এবং প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন একটু আগেই মহাত্মা গান্ধীর ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বাইরে মহাত্মা গান্ধীর ভাস্কর্য কেন?  কিন্তু নিজেই উত্তর খুঁজেছি। কারণ একটাই ব্রিটিশরা বুঝেছিলেন মহাত্মা গান্ধী কত বড় মাপের মানুষ। আমরা সবাই তার জীবনধারা ও আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি।
 
প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, গান্ধীর আদর্শ অনুসরণ করেই আমি ভারতবর্ষে দারিদ্র্য দূরীকরণ, বাসস্থান, জল, শৌচালয়ের ব্যবস্থা করে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। তার স্বপ্ন এমন একটি দেশ গড়ে তোলার যেখানে প্রতিটি মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা পেয়ে বেড়ে উঠবেন। মোদী জানান, ভারতের ১২৫ কোটি মানুষের মধ্যে ৮০ কোটিই যুবশক্তি যাদের বয়স ৩৫ বছরের কম। এই যুবশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভারতকে বিশ্বে উচ্চ আসনে দাঁড় করাতে চান বলেও উল্লেখ করেন মোদী। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর ও মরিসাসের পর ব্রিটেনই ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। আর ভারতে পরিবেশ আছে বলেই তারা বিনিয়োগ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অন্য দেশগুলোর তুলনায় ভারতীয়রা ব্রিটেনে বিনিয়োগেই বেশি উত্সাহ দেখান জানান তিনি।
 
মোদীর দাবি, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য ব্রিটেনকেই বেছে নেন। স্বভাবসুলভ মজার ভঙ্গিতে বলেন, ভারতে প্রত্যেক তরুণ ফুটবলারই বেকহ্যামের মতো হতে চান। তিনি বলেন, ভারতের বিজনেস আইকন টাটা ব্রিটেনের অন্যতম উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছিলেন। মোদী জানান, ভারতে রাজ্য ও কেন্দ্রের সম্পর্ক এখন অনেকটাই উন্নত হয়েছে। আর তাই বিশ্বের দুয়ারে এখন ভারতের পরিচিতি ‘টিম ইন্ডিয়া’ হিসেবে। তার মতে, ভারত ও ইউরোপ উদ্ভাবক দুই দেশ। গতকাল শুক্রবার ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মোদী।
 
এদিকে গতকাল প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, ভারতে অসহিষ্ণুতার কোনো স্থান নেই। অন্যদিকে, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরব লেখক-অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি লিখে নিজেদের প্রতিবাদ তুলে ধরেছেন তারা। মোদীর সঙ্গে আলোচনায় ভারতে অসহিষ্ণুতা ও ভীতির পরিবেশ ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলেন সালমান রুশদিসহ ২০০ জনেরও বেশি লেখক। মানবাধিকার বিষয়ে প্রকাশ্যেই মোদীকে প্রশ্ন করার দাবি জানিয়েছেন ব্রিটেনে ভারতের উন্নয়ন নিয়ে গবেষণারত অধ্যাপক ও গবেষকরাও।
 

শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, সম্প্রতি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) যে সংস্কার হয়েছে, তার ফলে ভারত বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে ভারতে বিনিয়োগ করা যেকোনো দেশের জন্য লাভজনক। ২০১৬ সালের মধ্যে জিএসটি চালুর ব্যাপারেও আশাবাদী মোদী। বৃহস্পতিবার ব্রিটেনে পা রাখতেই দেশটির সরকার রাজকীয় অভ্যর্থনা দেয় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন নিজে বেরিয়ে এসে হাত মিলিয়ে স্বাগত জানান মোদীকে। প্রায় ৯০ মিনিটের বৈঠক হয় তাদের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই সফরে ৯০০ কোটি পাউন্ডের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, অসামরিক পরমাণু চুক্তি, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহায়তা বাড়ানো এবং সন্ত্রাস দমনে একযোগে কাজ করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়।