ইসাবেল বোদেরি গত শুক্রবার রাতে বয়ফ্রেন্ডের সাথে গিয়েছিলেন ফ্রান্সের বাতাক্লা থিয়েটারে 'ঈগলস অব ডেথ মেটাল' রক ব্যান্ডের গান শুনতে। সেখানে গিয়ে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুকুপে পড়েও জীবন নিয়ে ফিরতে পেরেছেন। আইএস হামলার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা নিজের ফেসবুক পেজে লিখেছেন অত্যন্ত আবেগঘন বর্ণনায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া ২২ বছর বয়সী ইসাবেল প্রথমে মনে করেন ঘটনাটি হয়তো অনুষ্ঠানেরই অংশ। সামনের দরজাটা দিয়ে ঢুকেই ওরা এলোপাথাড়ি গুলি আরম্ভ করে। এটা যে সন্ত্রাসী হামলা সেটা তার বিশ্বাসই হয়নি তখন।
তিনি পোস্টে লিখেছেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝে গেলাম, এটা আসলে একটা হত্যালীলা। আমি দেখলাম, আমার ঠিক সামনেই গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছেন বহু মানুষ। রক্তবন্যা চারদিকে। কাছের মানুষের রক্তাক্ত দেহ আঁকড়ে ধরে কেউ কেউ চিৎকার করছেন। বড় বড় ফোড় হয়ে যাচ্ছে হলঘরের প্রত্যেকটা দেয়াল। মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল অনেকগুলো ভবিষ্যৎ। একা হয়ে গেল বহু পরিবার।অসহায় আমি হত্যালীলার মধ্যে। আমিও মড়ার ভান করে পড়ে রইলাম। এক ঘণ্টারও বেশি চেষ্টা করছিলাম শ্বাসও না নিতে, না নড়তে, না কাঁদতে। যে ভয়টাকে জাগাতে চায় ওরা, সেটাকেই জয় করতে চাইছিলাম আমি।
আমি ভাগ্যবান, আমি বেঁচে গিয়েছি কিন্তু যারা বাঁচলেন না, তারাও তো আমারই মতো সে দিন ক্লাবে আনন্দ করতে এসেছিলেন। আমরা তো কেউ কোনো পাপ করিনি। আসলে এ পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর। আর এই সন্ত্রাস হামলা মানুষের খারাপ দিকগুলোকেই যেন বার বার চোখের সামনে এনে দাড় করিয়ে দেয়। কোনও দিন ভুলতে পারব না ওই লোকগুলোর মুখ। এদের ছবি সারা জীবন তাড়া করবে আমায়। শকুনের মতো খুটি- নাটি দেখছিল ওরা। খেয়াল রাখছিল, যাতে ভুলেও কেউ প্রাণ নিয়ে ফিরতে না পারে। সত্যিই যে এটা হচ্ছে, তখনও মানতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কেউ এসে ঘুমটা ভাঙিয়ে দেবে। বলবে দুঃস্বপ্ন।
আমি কৃতজ্ঞ সেই মানুষটার কাছে, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে বাঁচিয়েছিলেন আমায়। কৃতজ্ঞ সেই দম্পতির কাছে, যাদের শেষ কয়েকটা কথা ছিল শুধু ভালবাসার, যারা আমায় বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন পৃথিবীটা এখনও সুন্দর। আমি কৃতজ্ঞ সেই পুলিশের কাছে, যার সাহায্যে বেঁচে গিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ভেবেছিলাম, আমার বন্ধুটিও বুঝি আর বেঁচে নেই। রক্তাক্ত এক জনকে দেখে ভেবেছিলাম, সেই আমার বন্ধু আমোরি। অঝোরে কাঁদছিলাম। বহু অপরিচিত লোক তখন সান্ত্বনা দিয়েছিলেন আমায়। বলেছিলেন, ভয় নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। যদিও তারাও তখন একা। তারাও তখন সন্ত্রস্ত, আমি কৃতজ্ঞ তাদের প্রতিও।
কিন্তু সেই ৮০ জন লোক, যারা হলের ভিতরেই মারা গিয়েছেন? তারা তো এখন জেগে উঠে দেখতে পাচ্ছেন না এই যন্ত্রণাটা! যে যন্ত্রণার পথ দিয়ে আজ হেটে যেতে হচ্ছে তাদের পরিবারকে। তাদের বন্ধুদের। আমি সত্যিই দুঃখিত। তবে জানি, কখনওই এ দুঃখে প্রলেপ দেওয়া সম্ভব নয়।