দশ টাকা দিলে রেলিংয়ে ও পাওয়ার কারে দাঁড়ানোর জায়গা মেলে

দশ টাকা দিলে ট্রেনের ইঞ্জিনের রেলিংয়ে এবং পাওয়ার কারে দাঁড়ানোর জায়গা মেলে! আর এ জায়গার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে রেলওয়ের এক শ্র্রেণির অসাধু কর্মচারি। ব্যাপারটি দায়িত্বে থাকা রেলওয়ে কর্মকর্তাদের অবগত করা হলে তারা নিজের দায়ভার কাটানোর জন্য বলেন, ‘ব্যাপারটি আমাদের জানা নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রেনের ইঞ্জিনে ঝুলন্ত মানুষ! ঢাকার কমলাপুর থেকে ৭.৩০ মিনিটে নারায়ণগঞ্জের উদেশ্যে ট্রেন ছেড়ে আসে। ট্রেনে মানুষ বেশি হওয়ায় ট্রেনে দাঁড়ানোর মতো জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। ট্রেনে জায়গা পাওয়ার জন্য কিছু যাত্রী টিকেট নিয়ে ট্রেনের পাওয়ার বগিতে উঠলে তাদের কাছে টিকেট থাকা সত্বেও অতিরিক্ত ১০ টাকা নিচ্ছে পাওয়ার বগির দায়িত্বে থাকা মেশিন মেকানিক ফারুকের নেতৃত্বে থাকা রাকিবসহ আরো কয়েকজন।

চলাচলরত ট্রেনে দেখা গেছে, কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মাঝপথের বিভিন্ন স্টেশন থেকে ২ শতাধিক যাত্রী ওঠে। এ সকল যাত্রীদের কাছে টিকেট থাকা সত্বেও জোরপূর্বক অতিরিক্ত ১০ টাকা করে উত্তোলন করা হচ্ছে।

এ সময় একজন যাত্রীর মানিব্যাগ হারিয়ে যায়। বগিতে থাকা যাত্রীরা দাবি করে এই বগিতে মোবাইল মানিব্যগ হারায় প্রতিনিয়ত। এই বগিতে যাত্রী উঠিয়ে রেলওয়ের অসাধু কর্মচারীরা মাসে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ট্রেনের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা স্টাফরা স্টেশনে ট্রেন থামলে পাওয়ার কার বগিতে আসে। তারা সেখান থেকে তাদের কমিশন বুঝে নেয়। এই টাকার বিষয়ে ট্রেনের সকল টিইটি জানে।

আরো পড়ুন: ফকিরহাটে ফাল্গুনি পরিবহন থেকে ৭শ ইয়াবা উদ্ধার

জানা গেছে, স্বল্প খরচে হাজারো যাত্রীর যাত্রাপথ এই রেলপথ। ১৬ কিলোমিটারের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে প্রতিদিন ১৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। ট্রেনে নারীদের জন্য একটি মাত্র বগি বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রতিদিন উপচে পড়া ভিড়ে যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কেউ ব্যাগ দিয়ে ট্রেনের সিট রাখে। কেউ ট্রেনের জানালা দিয়ে ওঠে। তবে এ পথে নিয়মের চেয়ে অনিয়মের মাত্রা অনেক বেশি চলছে। নেই নিরাপত্তা। ছিনতাইকারী মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ট্রেনের ভিতর থেকে মানিব্যাগ নিয়ে যায়। পথ জুড়ে নারী পুরুষের বাক-বিতণ্ডা শেষ হয় না।

এই ট্রেনের যাত্রী শেখ আসাদুল বলেন, ‘টিকেট কেটেছি ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার সময়। তাৎক্ষণিক উঠলাম ট্রেনে। পরে দেখি যেই বগিতে উঠেছি সেটি পাওয়ার বগি। ট্রেনের মধ্যে রেলওয়ের আইডিকার্ড গলায় ঝুলিয়ে একজন লোক ১০ টাকা দিতে বলে। আমি টিকেট দেখালাম। কিন্তু সে আমাকে চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে যেতে বলে। বাধ্য হয়ে ১০ টাকা দিতে হয়েছে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে সরকার বছর বছর বেতন বাড়ায় কিন্তু এদের পেট ভরে না কেন?’

ট্রেনের যাত্রী কলেজ ছাত্র মাসুদ বলেন, ‘ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া স্টেশনে আসার জন্য ১৫ টাকা দিয়ে টিকেট নিয়েছি। কিন্তু ট্রেনের কোন বগিতে জায়গা পাইনি। পরে ট্রেনের পাওয়ার বগিতে উঠি। কিন্তু এই বগিতে একজন বলে ১০ টাকা দিলে বগিতে করে যেতে পারবো আর না দিলে নেমে যেতে হবে।’

আরো পড়ুন: উদ্বোধনের বছরে ভেঙে পড়ে ব্রিজ, কেউ কথা রাখেনি ৩২ বছরেও

অপর আরেক জন যাত্রী আহাদ বলেন, ‘ট্রেনের যাত্রী বেশী কিন্তু জায়গা কম। ট্রেনের পাওয়ার বগিতে ওঠার সময় একজন লোক বাধা দেয়। সে বলে টিকেট থাকলেও উঠতে পারবে না। এই বগিতে উঠলে ১০ টাকা দিতে হবে।’

পাওয়ার বগির দায়িত্বে থাকা মেশিন মেকানিক ফারুক জানায়, ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেন মেসার্স এস আর ট্রেডিং নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলাচল করে। কিন্তু আমি ট্রেনের পাওয়ার বগির মেশিন মেকানিকের দায়িত্বে আছি। সরকার আমাদের বেতন দেয়। এছাড়া আরো কয়েকজন আছে তবে তারা বেসরকারি। তারা এভাবেই চলে। আর এ বগিতে উঠলে টাকা দিতে হবেই।’

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এ বি সিদ্দিক বলেন, ‘আমার লজ্জা হয় যে এ দায়িত্বে থাকা ব্যাক্তিদের চরিত্র এত খারাপ। তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায় করে। আমরা পর্যবেক্ষণ করে আন্দোলন গড়ে তুলবো।’

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন মাস্টার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমার এ বিষয়ে জানা ছিল না। তবে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যাধমে চলাচল করে। এস আর ট্রেডিং এর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এছাড়া আমরা বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাবো। যাতে করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

ইত্তেফাক/নূহু