কিকবক্সিং-এ সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং সফল ব্যাবসায়ী আলী জ্যাকো তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। জন্ম লন্ডনে হলেও শৈশবের বেশ কিছুটা সময় কেটেছে সিলেটের ছাতকে। লন্ডনে ফিরে এসে ১৬ বছর বয়সে ১৯৮৬ সালে তিনি মা বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বক্সিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন। ২০০২ সালে পেশাদার কিক বক্সিং থেকে অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন খেতাব অর্জন করেন। ১৭ বছর বয়সেরই আলী জ্যাকো পূর্ব লন্ডনে ফ্যাশন ডিজাইন এবং পোশাক কারখানা পরিচালনা করতেন। এরপর বক্সার হিসেবে পরিচিতি অর্জনের পর প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব মিডিয়া কোম্পানী জ্যাকো টিভি। এই প্রতিষ্ঠান স্কাই ও চ্যানেল ফাইভের হয়ে বিভিন্ন বক্সিং প্রতিযোগিতার ভিডিও ধারণের পাশাপাশি বক্সারদের নিয়ে নানা তথ্যচিত্র নির্মাণ করে প্রচারের ব্যবস্থা করে। মিউজিক করার জন্য তিনি একটি শক্তিশালী টিম তৈরি করেছেন। গান লেখায়ও পারদর্শী তিনি। নিজ লেখা গান দিয়ে তিনি এ যাবৎ কালের সবচেয়ে ব্যায়বহুল মিউজিক ভিডিও তৈরি করেছেন। ভিডিওটিতে মডেল হয়েছেন বিশ্বখ্যাত সুপার মডেল জোডি কিড। লন্ডনের শিল্পী ও গীতিকার আলী জ্যাকো তার গানের মধ্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তার গানের নাম ‘গিভ মাই লাভ এ ব্রান্ড নিউ নেম’। এই গানের মাধ্যমে তিনি তার রক ক্যারিরার শুরু করেছেন। ৪৬ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি তার বর্ণাঢ্য বক্সিং ক্যারিয়ারে পরাজিত হতে শেখেন নি। মিউজিক ক্যারিয়ারেও তিনি সফল হওয়ার জন্য বদ্ধ পরিকর। কিকবক্সিং এ কিংবদন্তি খ্যাত এই ব্রিটিশ বাংলাদেশী একান্ত আলাপচারিতায় তার শিল্পী জীবনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা, প্রেরণা এবং তার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন-
শিল্পী হওয়ার পেছনে কারণ কি?
আলী জ্যাকো: আমার শিল্পী হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। আমি জীবনে অনেক কিছুই করেছি। তবে সবসময় আমি গানকে ভালোবেসেছি। আমি বড় বড় শিল্পীদের ভক্ত। হঠাৎ যেদিন আমি মাইক্রোফোনের পেছনে দাঁড়াই তখনই আমি বিস্মিত হয়ে যাই। আমি গানের মধ্যে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে আমি শিল্পী হতে পারব। আমি নিজেও কোনোদিন ভাবিনি যে আমি গান গাইবো। গত তিন মাস আগে যখন গানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হলো, তখন মনে হলো, আমি চাইলে পারবো। সেই চাওয়া থেকেই কঠোর চেষ্টা চালিয়ে মাত্র তিন মাসে প্রথম গানের রেকর্ড আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছি।
IMG0
প্রশ্ন: আপনার প্রথম গানের নাম ‘গিভ মাই লাভ এ ব্র্যান্ড নিউ নেম’ দেয়ার কারণ কী?
আলী জ্যাকো: আমি যখন প্রথম গান রিলিজ করার সিদ্ধান্ত নেই তখন আমার পরিবারের কেউই ভাবেনি যে, আমি এতটা সিরিয়াস ছিলাম। তারা ভেবেছিলো আমার বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তাই আমি এটাকে ব্যাক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। আমি শক্তিশালী একটি টিম গঠন করেছি। কঠোর সাধনা করেছি আর তার ফল হিসেবে এই গান।
প্রশ্ন: এই গানটি কী অনুপ্রেরণা দেয় বলে আপনি মনে করেন?
আলী জ্যাকো: আমি মনে করি সকল গানই ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার ফল। এই গানটিও তার ব্যাতিক্রম নয়। আমি যা, এই গানটির মধ্যে তাই প্রকাশিত হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে গানটির মধ্যে ইউনিভার্সাল সেন্টিমেন্ট রয়েছে। যা সবাই পছন্দ করবে। যারা প্রেমে পড়েছে অথবা প্রেমে বিফল হয়েছে তারা এই গানটি দ্বারা প্রভাবিত হবে। মাঝে মাঝে মানুষ বুঝতে পারে না তারা কী হারিয়েছে। এই গানটি তাই বুঝতে সাহায্য করবে।
প্রশ্ন: এই মিউজিক ভিডিও সম্পর্কে কিছু বলবেন?
আলী জ্যাকো: এটা আমার প্রথম মিউজিক ভিডিও। আমি ভিডিওটি সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে ধারন করেছি। ভিডিওতে কিছু মজাদার লোকেশন রয়েছে। এছাড়া জোডি কিডের মত বিখ্যাত মডেল আমার সাথে মিউজিক ভিডিও করতে রাজি হওয়ায় আমি ধন্য হয়েছি।
IMG1
প্রশ্ন: জোডি কিডের সাথে কাজ করে কেমন লাগল আপনার?
আলী জ্যাকো: জোডি কিড একজন বিশ্বখ্যাত সুপার মডেল। আমি তাকে সত্যিই ভালোবাসি। সে গ্রেট পারসোনালিটির অধিকারী। আমি তার সাথে আরো কাজ করতে চাই। ভবিষ্যতে মিউজিক ভিডিও নিয়ে আরো নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
প্রশ্ন: প্রথম গানে আপনি কেমন সাড়া দেখেছেন?
আলী জ্যাকো: প্রাথমিকভাবে খুবই অকল্পনীয় বেশ সাড়া পেয়েছি। গানটি দর্শকদের কাছে হৃদয়স্পশী বলে অনেকেই জানান। গানের সুর, ছন্দ ও কথা সবকিছু মিলে চমৎকার সাড়া পেয়েছি। যা আগে ভাবি নি।
প্রশ্ন: মিউজিক ভিডিওটি করার আগে আপনি কী কোন মিউজিক্যাল মাস্টার প্লান করেছিলেন?
আলী জ্যাকো: আমার বক্সিং ফাইটিং এবং ব্যাবসায়িক উভয় ক্ষেত্রে আমি দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলম আর তাই আমি খুবই সফল। সুতরাং মিউজিকের ব্যাপারেও আমি খুব সিরিয়াস। আমি অবশ্যই প্লান করেছিলাম। আমি দুই মাস ধরে ১৫টি গান লেখার পর সেগুলো বারবার পর্যালোচনা করেছি। আমি সেগুলো বিখ্যাত শিল্পীদের সাথে শেয়ার করেছি। আমি ব্যাক্তিগতভাবে নিশ্চিত হতে চেয়েছি যে, গানগুলো অবশ্যই অদ্বিতীয়। আমি জানি, কিছু কিছু গান অনেকের কাছে ভালো নাও রাখতে পারে। তবে আমি মনে করি মানুষ আবেগকে ভালোবাসে, আমি তাই চেয়েছি। যদিও আমি রক গানকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসি। আমি গানের মধ্যে বৈচিত্র্যতা আনতে চেয়েছি। এ ব্যাপারে আমি বিখ্যাত শিল্পীদের সাথে একাধিকবার আলোচনা করেছি। আমি সারা বিশ্বে আমার প্রথম গানটি ছড়িয়ে দিতে চাই। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ৭৫০টি মিউজিক টিভি এবং রেডিও চ্যানেলে গানটি প্রচার হবে।
IMG2
প্রশ্ন: ভারতের শোবিজ জগতের সাথে আপনার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বলিউডে একাধিক হাই প্রোফাইল তারকা আপনার বন্ধু। আপনার কী ভারতে এই গান নিয়ে কোন চিন্তা করেছেন?
আলী জ্যাকো: আমি ভারতসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমার গান প্রচার করতে চাই। আমি চাই সবাই আমার গান উপভোগ করুক। তবে হ্যা, ভারতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি একটি বড় প্লাটফর্ম। আমি তার একটি অংশ হতে চাই। আশা করি খুব শিগগির তা হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: আপনার শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আপনার বন্ধু সালমান খানের চিন্তা ভাবনা কী বলে আপনি মনে করেন?
আলী জ্যাকো: অন্যদের মত তিনি আমার জন্য অস্বস্তিতে পড়তে চাননা। তবে তিনি খুবই উৎসাহদাতা একজন মানুষ। তিনি বলেছেন, আমি যদি গান করতে পারি তাহলে তিনি আমাকে সকল সহযোগিতা করবেন। আমি তাকে বলেছি, তার আশির্বাদ আমার জন্য সবকিছুর উর্ধ্বে। বন্ধুত্ব এবং তার শুভকামনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সালমান খানকে যতদুর চিনি তিনি মহৎ মনের মানুষ। তিনি সবসময় আমার খোঁজ খবর নেন। এই গানেরও তিনি প্রশংসা করেছেন।
প্রশ্ন: আপনি কী ধরনের মানুষের সাথে কাজ করতে আগ্রহী?
আলী জ্যাকো: আমার মত যাদের মিউজিক করার উদ্যেশ্য রয়েছে এমন যে কোন মানুষের সাথে আমি কাজ করতে আগ্রহী। প্রতিষ্ঠিত কোন শিল্পী হোক বা নতুন শিল্পী হোক সবার জন্য আমার দরজা খোলা। আমি ইতিমধ্যে কিছু বিখ্যাত মিউজিশিয়ান এবং গীতিকারদের সাথে কাজ করে ধন্য হয়েছি। তাদের সাথে আমার কাজ চলমান থাকবে। এছাড়া পরবর্তী কাজ নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্রশ্ন: আপনি তো অনেক বড় একটি লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগুচ্ছেন। আপনার কী মনে হচ্ছে যে, আপনি অনেক বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন?
আলী জ্যাকো: আমি যদি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতাম তাহলে আমি প্রফেশনাল যুদ্ধে কখনোই জিততে পারতাম না। আমি কোন চ্যালেঞ্জ বা বাধাকে ভয় পাইনা। যত বড় পদক্ষেপই আমি গ্রহণ করি না কেন আমি তা করে ছাড়ব। চ্যালেঞ্জ যত বড়, আমার মোটিভেশন তত বেশী।
প্রশ্ন: আপনি তো গান লেখায়ও পারদর্শী। কিভাবে আপনি এই অনুপ্রেরণা পেলেন?
আলী জ্যাকো: ভালো কথা বলেছেন। আমি বিশ্বাস করি আমার জীবনের জন্য গান একটি পুরষ্কারস্বরুপ। গান আমার ভালোবাসাকে উজ্জীবিত করেছে যা আমাকে গান লেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আমি কখনোই ভাবতে পারিনি আমি আমার আবেগ অনুভূতিগুলোকে কাগজে কলমে প্রকাশ করতে পারব। কিন্তু যখন আমি করলাম তা আমাকে এবং অনেক বিখ্যাত মানুষকে বিষ্মিত করেছে।
প্রশ্ন: মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির চ্যালেঞ্জের সাথে আপনার কিকবক্সিং জীবনকে কিভাবে তুলনা করছেন?
আলী জ্যাকো: মিউজিক এবং কিকবক্সিং সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ইন্ডাস্ট্রি। এ দুটির জন্য পৃথক যোগ্যতা দরকার। কিকবক্সিং একটি কষ্টসাধ্য যুদ্ধ। কিন্তু মিউজিকের জীবন চমৎকার। এর প্রতিটি মুহুর্তকে আমি ভালোবাসি। আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে একে উপভোগ করার আশাবাদী। আমি আসলে মানুষের জন্য কিছু চমৎকার মিউজিক সৃষ্টি করতে চাই যা মানুষ শুনতে চায় এবং দীর্ঘদিন মনে রাখবে। আমি মিউজিকের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে চাই। এটাই আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য।
প্রশ্ন: আপনার সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি কী?
আলী জ্যাকো: আমি নিজেই আমার সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি। মূল বিষয় হলো, আমি একজন ব্রিটিশ বাংলাদেশী। আমার লক্ষ্য হলো এই ক্ষেত্রে নতুন কিছু করে দেখানো। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
প্রশ্ন: মিউজিকের কোন বিষয়টি আপনাকে বেশী উৎসাহ দেয়?
আলী জ্যাকো: এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। আমি শত শত শিল্পীর কথা বলতে পারি যারা আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বব মারলী, টিনা টুর্নার, বিলি ওসান, বিলি রে সাইরাস, এলভিস প্রিসলে, জেমস ব্লান্ট, ব্রায়ান এডামস, মাইকেল জ্যাকসন, গানস এন রোজেস, হুইটনি হাসটন, জেনিফার লোপেজ, লিওনার্ড চোহান, ফিল কলিন্স, রব্বি উইলিয়ামস, এড শিরান, এনরিক ইগলেসিয়াস, দ্যা ব্লাক আইড পিয়াস, স্টিং শ্যাগি, চাকা ডেমাস, অ্যাপেস ইন্ডিয়ান, জেনারেল লেভি, সাবা র্যাংক।
প্রশ্ন: আপনার বিষয়ে অনেকেই জানে না এমন কোন বিষয়ে আমাদের বলুন?
আলী জ্যাকো: অনেকেই আছেন যারা আমার বিষয়ে জানেন না। আশা করছি গানের মাধ্যমে আমার খুবই ব্যাক্তিগত বিষয়গুলো তাদের জানাতে পারব। আমি গানের মাধ্যমে আমার হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে চেয়েছি। বিশেষ করে আমার প্রথম গান ‘গিভ মাই লাভ এ ব্র্যান্ড নিউ নেম’ এ মাধ্যমে।
প্রশ্ন: আপনি তো রোমান্টিক গান লিখছেন। ইতিমধ্যে একটা মিউজিক ভিডিও রিলিজ করেছেন। আপনি কতটা রোমান্টিক বলে মনে করেন?
আলী জ্যাকো: আমি নিজে জানি আমি কী। বাকিরা এ প্রশ্নের ভালো উত্তর দিতে পারবেন।
প্রশ্ন: আপন কেন এই একক গানটিকেই বেছে নিলেন?
আলী জ্যাকো: আমি আশা করছি যে, মানুষ গানটি শোনার পর কোন দ্বিধা ছাড়াই গানটি পছন্দ করবে। আমি মনে করি, এই গানটিই হবে আমার মিউজিক জগতে প্রবেশের প্রথম পদক্ষেপ।