আবার স্নায়ুযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে বিশ্ব

সিরিয়ার আকাশে মঙ্গলবার তুরস্কের সেনাবাহিনী একটি রুশ যুদ্ধবিমান গুলি করে নামিয়ে দেয়ার পর গতকাল বুধবার প্রকাশ্যেই তুরস্কের পাশে দাঁড়িয়েছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট। গত অর্ধ শতাব্দীতে এই প্রথম কোনো রুশ যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামাল ন্যাটো জোটের কোনো দেশ। খুব স্পষ্ট করেই ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল জেন্স স্টোলেনবার্গ জানিয়ে দিয়েছেন, জোটের সবগুলো দেশই তুরস্কের পাশে রয়েছে। তবে উত্তেজনা যত তাড়াতাড়ি কমানো যায়, ততই ভাল। তবে উত্তেজনা বাড়ছে তার প্রমাণ গতকাল রাশিয়ায় তুর্কি দূতাবাসে হামলা। যদিও হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। রাশিয়া তুরস্ক সফরে নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের পর এই প্রথম ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশ রুশ যুদ্ধবিমানের উপর হামলা চালাল। তাই ‘পরিণতি’ ঠিক কী হতে চলেছে, তা নিয়ে আশঙ্কার ছায়া ঘনাচ্ছে পশ্চিমা দুনিয়ায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের আমলের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।  খবর রয়টার্স, সিএনএন ও আনন্দবাজার পত্রিকার।
 
সিরিয়াকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু দিন ধরেই দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে গোটা বিশ্ব। গত সেপ্টেম্বরে সিরিয়ার আকাশে প্রথম রুশ যুদ্ধবিমান ঢুকে পড়ার পরেই আমেরিকা অভিযোগের আঙুল তুলে বলেছিল, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে মদদ দিচ্ছে রাশিয়া। মস্কো সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, আইএস জঙ্গিদের দমন করতেই সিরিয়ার আকাশে ঢুকেছে রুশ যুদ্ধবিমান। উল্লেখ্য, সিরিয়ার আসাদ সরকারকে একেবারেই পছন্দ নয় তুরস্কের।
 
প্যারিস হামলার পর পরিস্থিতি অল্প সময়ের জন্য হলেও, কিছুটা পরিবর্তন হয়েছিল। আইএস জঙ্গিদের দমনে করতে সিরিয়া ও সিরিয়ার বাইরে অন্য দেশেও রাশিয়া ও ফ্রান্সের কাছে আরো বেশি সামরিক সক্রিয়তার দাবি জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে বৈঠকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া ওলাঁদ আইএস জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে লড়ার জন্য রাশিয়ার হাতে হাত মেলানোর আবেদন জানিয়েছিলেন ওয়াশিংটনের কাছে। কিন্তু মঙ্গলবার তুরস্কের ঘটনা ফের পরিস্থিতিকে থমথমে করে দেয়। গোটা বিশ্বকে আবার কার্যত, দুই পক্ষে ভাগ করে দিল। যার একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো। আর অন্যদিকে রাশিয়া। সেই স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মতো?
 
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা মঙ্গলবার মন্তব্য করেছিলেন, আইএস জঙ্গি নয়, বাস্তবে প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরোধী মধ্যপন্থীদের শায়েস্তা করতেই সিরিয়ার আকাশে রুশ যুদ্ধবিমান ঢুকে পড়েছে। আর রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের কথায়, আসলে জঙ্গিদের সাহায্য করতেই আমাদের পিছন থেকে ছুরি মেরেছে তুরস্ক! পুতিন যাই দাবি করুন, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোলু কিন্তু অনড়। কিছুটা কড়া সুরেই নাম না করে রাশিয়ার উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন, এটা সকলেরই জানা উচিত যে, দেশের আকাশ কিংবা জমির সীমা লঙ্ঘন করলে যে কোনো পদক্ষেপ করার অধিকার আমাদের রয়েছে। যদিও তিনি গতকাল বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে আর কোনো উত্তেজনা বাড়াতে চায় না তার দেশ।
 
গত শুক্রবার রুশ রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়ে সিরিয়া সীমান্তে সেনা অভিযান বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছিল আঙ্কারা। এমনকি রাষ্ট্রদূত অ্যান্ড্রে কারলভকে কার্যত হুমকি দিয়ে সেদিন আঙ্কারার পক্ষে বলা হয়েছিল, অভিযান থামানো না হলে পরিণতি খারাপ হবে। বস্তুত, মঙ্গলবার রুশ যুদ্ধবিমানটিকে গুলি করে নামানোর ঘণ্টাখানেক আগে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তুর্কমেন প্রদেশে রুশ সেনা-অভিযানের প্রসঙ্গ তুলেছিল তুরস্ক।
 
মস্কো অবশ্য স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘তুরস্ক-রাশিয়া সম্পর্কের উপর এই ঘটনার প্রভাব পড়বেই। পরিণতি ভুগতেই হবে তুরস্ককে’। আশঙ্কা থাকলেও আশা আছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট যেমন বলছেন, তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। তেমনি রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, এ নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়াবে না রাশিয়া। বরং আইএসবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। রুশ ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গতকাল টেলিফোনে আলাপ করেছেন।