বিএনপির অনেক প্রার্থী পালিয়েছে

এতদিন উদয়াস্ত এলাকা চষে বেড়িয়েছেন তিনি। দিন-রাত এক করে ফেলেছেন। দোয়া চেয়েছেন ঘরে ঘরে। দলের মনোনয়ন পেয়েছেন লবিং করেই। অতঃপর অকস্মাত্ জনারণ্য থেকে ডুব দিয়েছেন মৌলভীবাজার সদর পৌরসভার বর্তমান মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই শহরজুড়ে গুজবে তোলপাড়। ময়ূনের খোঁজ মিলছে না। জানা গেল, তিনি নির্বাচন করবেন না। বড়লেখায় বর্তমান মেয়র ফখরুল ইসলামও বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।

 
প্রায় অভিন্ন অবস্থা দেশের বহু পৌর এলাকার। বিএনপির অনেক যোগ্য এবং সাবেক মেয়র নির্বাচন থেকে পিছুটান দিয়েছেন। অনেকে আগ্রহই দেখাননি। কেন্দ্র মনোনয়ন দিতে পারে —এই ভয়ে কেউ কেউ আত্মগোপন করেছেন। সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে যখন নেতাদের তীব্র  প্রতিযোগিতা, লড়াই-বিদ্রোহ; তখন বিএনপির চিত্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপরীত। মনোনয়নের প্রত্যয়নপত্র পাওয়া যেন তাদের কাছে মামলা-গ্রেফতারের আতঙ্কের মোসাবিদা।
 
দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, তৃণমূলের পাঠানো মতামতের ভিত্তিতে একটি পৌরসভায় আমাদের মূল যে প্রার্থী তাকে যোগাযোগ করতে বলা হলো। তিনি যোগাযোগ করলেন। তারপর হঠাত্ তার আর কোনো খবর নেই। পরে বাধ্য হয়ে অন্য প্রার্থীকে দিতে হলো মনোনয়ন। এমন অবস্থা হয়েছে কোথাও কোথাও।
 
দলের নির্বাচনী কাজের সমন্বয়ে থাকা এক নেতা জানান, খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় বিএনপির নেতা মিরাজুল ইসলামকে মেয়র পদে মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করে স্থানীয় বিএনপি। দল থেকে তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে মিরাজুল ইসলামের পক্ষ থেকে জানান হয়, তিনি নির্বাচন করবেন না। নির্বাচন করলে তাকে জেল-জুলুম-হয়রানির হুমকি এসেছে। ফলে বিএনপি বিকল্প প্রার্থী খুঁজতে থাকে। নির্বাচন করার মতো যোগ্যতা সম্পন্ন যারা আছেন সেখানে, তারা কেউ কেউ অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে পাইকগাছার আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তারকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়া হয়। তিনি বলেন, কেবল পাইকগাছা নয়, দেশের বহু পৌরসভায় এই অবস্থা হয়েছে। তৃণমূল বিএনপি যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, কেন্দ্র তাকে দিতে পারেনি। বিএনপির গুলশান অফিস জানায়, গ্রেফতার আতঙ্কে মনোনয়ন পেয়েও পিছুটান দিয়েছেন অনেকে। ইতোমধ্যে মেয়র পদের তিন প্রার্থীর নামে নাশকতার মামলা হয়েছে। অনেকে আত্মগোপনে থেকেই নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
 
এদিকে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার ভেতর অদক্ষ এবং সীমিত জনবল নিয়ে বিএনপির প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা করে ফেলেছে। বাছবিচার না করে পুরনো নেতাদের প্রার্থী করতে গিয়ে ১০২ বছরের এক বৃদ্ধ নেতাকেও মনোনয়ন দিয়ে তা আবার প্রত্যাহার করে নেয়। ঐ নেতার বাড়ি বৃহত্তর কুষ্টিয়া এলাকায়। এছাড়া মনোনয়নপ্রাপ্তদের বহু নেতা আছেন যাদের বয়স ৭০-৮০ ঊর্ধ্ব।
 
এদিকে বিএনপিতে দলের কোনো কোনো সাবেক মন্ত্রী এবং এমপিরা তাদের নিজ নিজ এলাকার পৌরসভাগুলোর প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে খবরদারি করেছেন। তারা তৃণমূলের মতামত অগ্রাহ্য করে নিজেদের পকেটের লোক বা পরিবারের লোকদের মনোনয়ন নিয়ে দিয়েছেন। গুলশান অফিসের একটি সূত্র জানায়, রাজশাহী বিভাগের দুর্গাপুর পৌরসভায় তৃণমূল নেতারা মনোনয়ন দেন সুভেন্দ নাথকে। কিন্তু দলের সাবেক এমপি প্রার্থী কায়সার কামাল প্রভাব খাটিয়ে জোর করে তার নিজের প্রার্থীকে মনোনয়ন নিয়ে দেন। বরিশাল এলাকায়ও এমন ঘটনা ঘটেছে।
 
কেন্দ্রের এক প্রভাবশালী নেতার প্রভাবে ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা মামলার অন্যতম আসামি জাহাঙ্গীর কামাল মাদারীপুরের শিবচরে বিএনপির প্রত্যয়নপত্র পেয়েছেন। এ নিয়ে গতকাল রাতে রাজধানীর গুলশানস্থ বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন মাদারীপুর বিএনপির নেতাকর্মীরা।
 
তারা বলেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। সংস্কারপন্থি ও আওয়ামী লীগ থেকে বিতাড়িতদের মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। তারা এ সময় ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা মামলার চার্জশিটের কপি বিতরণ করেন সাংবাদিকদের মাঝে। এ সময় সেখানে কিছুটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
 
বিএনপির প্রত্যয়নপত্র বিতরণ সমাপ্ত
 
গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় গুলশানে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে প্রত্যয়নপত্র বিতরণ শেষ হয়। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন গতকাল দুপুর সোয়া ২টায় জামালপুরের তিন মেয়র প্রার্থীর হাতে প্রত্যয়নপত্র তুলে দিয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো প্রত্যয়নপত্র বিতরণ শুরু করেন। রাত ৮টা পর্যন্ত টানা বিতরণ চলে।
 
এদিকে প্রত্যয়নপত্র বিতরণ উপলক্ষে বুধবার সারাদিন গুলশানে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে মেয়রপ্রার্থী, দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড় ছিল।
 

প্রত্যয়নপত্র হাতে পাওয়ার পর মেয়রপ্রার্থীদের সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা উল্লাস করেছেন, আবার যারা পাননি তাদের সমর্থকরা বিক্ষোভও করেছেন।