তহবিলের অর্থ নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভিন্ন মত

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে উন্নত দেশগুলো যে একশ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার অঙ্গীকার করেছিলো তাতে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ইতোমধ্যে এ খাতে একশ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার মিলেছে। উন্নত দেশগুলোসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ২০২০ সালের মধ্যে এ অর্থ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর বিপরীতে ছাড় করবে।

 
কিন্তু এ অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্যারিস জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে নানা মত আসছে। উন্নত দেশগুলোর কেউ কেউ এবং দাতাদের প্রায় সবাই চাইছে এ অর্থ স্বল্পসুদে ঋণ দিতে। কিন্তু ঘোরতর আপত্তি তুলেছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাদের মতে, যেহেতু উন্নত দেশগুলোর দূষণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে সেহেতু এ অর্থ তাদেরকে অনুদান হিসেবে দিতে হবে। প্যারিস সম্মেলনের জন্য  বাংলাদেশ যে অবস্থানপত্র জমা দিয়েছে তাতেও বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ঋণ নয়, অনুদান হিসেবে এ অর্থ দেবার দাবি করছে।’ সম্মেলনে যোগ দেবার আগে বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।
 
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বলেছেন, অর্থ ঋণ হিসেবে দেয়া হলে তা অনুন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বোঝা হবে। কিন্তু এ দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মোটেও দায়ী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূত টড স্ট্রেন বলেছেন, একশ বিলিয়ন ডলার অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে দাতা দেশগুলোর সাড়া ইতিবাচক। তিনি জানান, অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) যে রিপোর্ট তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, ইতোমধ্যে দেশগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণ করেছে। কিন্তু এ অর্থ কিভাবে ব্যয় করা হবে সে বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি তারা। এ নিয়ে উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়ে গেছে।
 
সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মত হচ্ছে, একশ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে দেয়া হলে তা অনুদান হবে না বরং তা হবে বিনিয়োগ। জাম্বিয়ার পরিবেশ মন্ত্রী ওসমান জারজু বলেন, অর্থ ঋণ হিসেবে নিতে হলে তা গরিব দেশগুলোর জন্য বোঝা হবে। অনেক দেশেরই এ অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য নেই। উন্নত বিশ্বকে এ অর্থ অনুদান হিসেবে দিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে যে আলোচনা চলছে তার জন্য উন্নত দেশগুলোই দায়ী। তিনি আরো বলেছেন, আমরা চাইছি জাতিসংঘের মাধ্যমে এ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হোক। একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তার অধীনে এ অর্থ ব্যয় করতে হবে। প্যারিস সম্মেলনে এ বিষয়ে আমরা বার বার দাবি তুলছি। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনছে না।
 
এদিকে বেসরকারি সংস্থা অক্সফাম একশ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ব্যয় নিয়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। সংস্থার নীতি পরামর্শক জান কাওয়াজলিক বলেছেন, এ অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়া যদি উন্নত দেশগুলোর হাতে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে তা হবে আত্মঘাতী। উন্নত দেশগুলো বাস্তবতা থেকে এখনো অনেক দূরে। তারা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করার চেষ্টা করছে।
 
এদিকে, আর একদিন পরেই প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শুরু হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এ বৈঠকের জন্য একটি খসড়া তৈরি করেছেন।
 
কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য একটি আইনগত বাধ্যবাধকতা চুক্তি করার বিষয়ে প্যারিস সম্মেলনে এখনো তর্ক বিতর্ক চলছে। তবে, ইউএনএফসিসিসির নির্বাহী সেক্রেটারি ক্রিস্টিনা ফিগুরাস ও সম্মেলনের সভাপতি লরা ফেবিয়াস প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করছেন সমঝোতায় পৌঁছাতে।
 
এডাপটেশন ফান্ড বোর্ড বিলুপ্তের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছে বিভিন্ন দেশের এনজিও। গতকাল সম্মেলন কেন্দ্রে ফান্ডটি চালু রাখার জন্য তারা বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীরা এ ফান্ডকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ অভিহিত করে।
 
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সমন্বয়ক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, উন্নত বিশ্ব এখন অন্য দেশের দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তারা অর্থায়ন ও অন্যান্য বিষয়ে ছলচাতুরি করছে। প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের কারণে কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। সম্মেলনে এবার এলডিসিভুক্ত দেশগুলো, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, নিউজিল্যান্ড, কাতার, কলম্বিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, বলিভিয়া, ব্রাজিল ও সৌদি আরবসহ আরো কিছু দেশ সরাসরি তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে।
 
তবে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নরোধে বিশ্ববাসীর হাতে বেশি সময় নেই। শুধু উন্নত বিশ্বকে এর জন্য দায়ী না করে সকলে মিলে এর সমাধানে কাজ করতে হবে।
 

উন্নত বিশ্বকে শুধু অর্থ ও প্রযুক্তি দেয়ার ব্যাপারে চাপ দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতাদের প্যারিস চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়ার আহবান জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করছেন। দ্বিপাক্ষিক এসব বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরছেন।