বাঙালি জাতির গৌরবের মাস ডিসেম্বর। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই মানচিত্রে আমাদের প্রণম্য মুক্তিযোদ্ধা তারকাদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবছর বিজয়ের মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে শিল্পী-কুশলীদের লেখা বা স্মৃতিগদ্য ছেপে থাকি। এ বছরে পুরো মাসজুড়ে তারকাদের বয়ানে থাকবে তাদের দেখা যুদ্ধকালীন খণ্ডচিত্র। এ নিয়েই পুরো ডিসেম্বরের আয়োজন ‘সেই সময়’। আজ লিখেছেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী শাহীন সামাদ
১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে। আমাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী স্মৃতি সংস্থা’ একটি সিদ্ধান্ত নিলো যে, মুক্তাঞ্চলে গিয়ে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গান শুনিয়ে আসতে হবে। এই উদ্দেশ্যে সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে আমিসহ দেবু, স্বপন চৌধুরী, বিপুল ভট্টাচার্য, তারেক আলী, লতা চৌধুরী, শারমিন মোর্শেদ, লায়লা খান, লুবনা মরিয়ম যাওয়ার জন্য মনোনীত হই। অনেকেরই যাওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু আমরা যাবো ছোট্ট একটি ট্রাকে করে, আর অতটুকু ট্রাকের মধ্যে সবাই ধরবে না। যাই হোক, সেখানে একজন ক্যামেরাম্যান ছিল, তিনি বললেন, ‘কাউকে বিরক্ত করবো না, তোমরা যেখানে যেখানে যাবে আমি সাথে সাথেই থাকবো।’ ট্রাকে একের পর এক গ্রাম পাড়ি দিতে হলো, এর মধ্যে ঘুম, খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই, তারই মধ্যে কত ঘটনা। খোলা আকাশের নিচে ট্রাকের মধ্যে থাকা ও ঘুমানো। অনেক ধৈর্য্য, অনেক ভালোবাসা ও চেতনার মধ্যে দিয়ে এসব কাজ করেছি। ট্রাকটিই আমাদের জন্য এক ধরনের বাড়ি হয়ে উঠেছিল। প্রায় দশ থেকে পনের দিন পাটশাক খেয়ে থাকতে হয়েছে। মাঝে মাঝে গ্রামের লোক খাইয়েছে। ট্রাকটিই আমাদের ঘর, আমাদের গাড়ি, এমনকি আমাদের স্টেজও। এই ট্রাককেই স্টেজ বানিয়ে গান শোনাতাম। আমাদের সাথে দেবু ছিল, সবারই পোশাক-আশাকের অবস্থা খুবই খারাপ, তাই আমরা ভাবলাম, দেবু যদি অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে তবলা আর ঢোল বাজাবে কে, আমাদের তো গানই হবে না! ওকে অসুস্থ হতে দেওয়া যাবে না। তাই আমার গায়ের চাদরটা আমি তাকে দিই। এই কথাটি দেবু এ মাসেরই ১ তারিখ দেশ টিভির একটি অনুষ্ঠানে আমাকে আবারও মনে করিয়ে দেয়। তারপর সেখান থেকে আমরা যখন মুক্তাঞ্চলে গেলাম তখন আমাদের মধ্যে একটা অন্যরকমের অনুভূতি এলো, পতাকা নিয়ে, মাটি মাথায় নিয়ে...আরও অনেক কিছু। মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে গাইলাম, সে এক অন্যরকম অনুভূতি। তখন দেখলাম, ছোট্ট ছোট্ট ছেলেদের দেশের প্রতি কী দারুণ ভালোবাসা, আমরা তো চাক্ষুস দেখেছি। তাদের রক্ত যে কত গরম ছিল, দেশের জন্য যে ভালোবাসা, জীবন উত্সর্গ করা এ সবকিছু তখন তাদের চোখে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম। এ এক অন্য অনুভূতি, অন্য অহঙ্কার। সব সময়ই ওই মুখগুলো আমার অনুভূতি ও চেতনার মধ্যে জীবিত থাকবে। আমাকে অন্য ধরনের একটা শক্তি ও সাহস দেয় ওইসব মুখের ছবি।
তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ ছবিটির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর মানুষরা জানতে পারে আমরা সঙ্গীতশিল্পী হয়েও যে বিভিন্ন উপায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছি। দেড় ঘণ্টার এই ছবিটির মাধ্যমে অনেককিছু তিনি দেখিয়েছেন। সরাসরি বন্দুক না ধরলেও মুক্তিযুদ্ধে কীভাবে অবদান রেখেছি তার প্রমাণ। তার এই ছবিটি না হলে বোধহয় বাঙালিরা জানতোও না সঙ্গীতশিল্পীদেরও মুক্তিযুদ্ধে কোনো ভূমিকা আছে। তারপরও আমাদের একটা জাতীয় চরিত্র আছে, খুব সহজে যে কাউকে ভুলে যাই। আজ আমাদের দেশে কোনো বীর দেখা যায় না, শুধু একাত্তরেই দেখেছি।
সবাইকে আমার পক্ষ থেকে বিজয়ের শুভেচ্ছা।