পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে কৃষকের মন জয় মোদীর!

তালেব রানা

 

কয়েক বছর ধরেই কৃষক ও গ্রামীণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বিজেপির বিরুদ্ধে। গত ১ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকারের বাজেট ঘোষণার দিনে ফসলের ন্যায্য দামের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কার্যালয় ঘেরাও করে উত্তর প্রদেশের কৃষকরা। এর কিছুদিন আগে মহারাষ্ট্রের নাসিকে পেঁয়াজের দাম নেমে যায় প্রতি কেজি এক থেকে দেড় রুপিতে। এক কৃষক ৭৮০ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করে ১১৩৫ রুপিতে। ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে এই টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠিয়ে দেন ওই কৃষক। একই ইস্যুতে সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে কৃষকদের লং মার্চ হয়। সেখানে প্রায় দুই লাখ কৃষক যোগ দেন। বিপুল সংখ্যক কৃষক ও গ্রামীণ জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বছরের ডিসেম্বরে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও। ওই নির্বাচনে বিজেপির ‘হার্টল্যান্ড হিসেবে পরিচিত’ তিন রাজ্যে পরাজয় দেখে দলটি। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগে তাই কৃষক অসন্তোষ নিয়ে চরম দুর্ভাবনায় পড়েছিল বিজেপি। কৃষকের মন জয় করতে বাজেটে তাদের জন্য একগুচ্ছ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষাণ প্রকল্পের আওতায় ২ হেক্টরের কম জমি রয়েছে এমন কৃষকদের নগদ ৬ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১২ কোটি কৃষক পরিবার উপকৃত হবেন।

নানা সুবিধা দিয়ে কৃষকের মনজয়ের চেষ্টায় থাকা মোদীর সরকার নির্বাচনের মাস দেড়েক আগে বড় অস্ত্র ছুড়েছে। সেটা হলো কাশ্মিরে জঙ্গি হামলার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের বালাকোটে জইশ-ই-মোহাম্মদের ঘাঁটিতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা। ভারতের দাবি, এই হামলায় তিনশোর বেশি জঙ্গি নিহত হয়েছে। এই হামলার পর ভারতের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ-উল্লাস করে জনগণ। বিশ্লেষকরা বলছিলেন, ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানে বিমান হামলা নরেন্দ্র মোদীকে আগামী নির্বাচনে বড় সুবিধা এনে দেবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে এখন সেই তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে।

পাকিস্তানে বালাকোটে কোনো জঙ্গি মারা গেছে কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নরেন্দ্র মোদীর প্রতি আস্থা বেড়েছে ভারতীয়দের। বিশেষ করে কৃষক ও গ্রামীণ জনগণ আস্থার কথা জানাতে শুরু করেছেন। লোকসভা নির্বাচনের আগে এই বার্তা বিজেপির মুখে হাসি ফুটিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপে মোদীর ওপর আস্থা বাড়ছে। মহারাষ্ট্রের ৩৪ বছর বয়সী কৃষক বান্দু বেলকার বলেন, ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু কৃষকদের প্রতি মোদী সরকারের অমনোযোগী আচরণে তিনি খুবই নাখোশ ছিলেন। তিনি এবারের নির্বাচনে বিরোধীদল কংগ্রেস ভোট দেবেন বলে ইতোমধ্যে মনস্থির করে ফেলেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের ভূ-খণ্ডে বিমান হামলার পর তিনি তার মত বদলেছেন। তার মতে, পাকিস্তানকে পরাজিত করতে নরেন্দ্র মোদীর মতো একজন লৌহমানব দরকার। প্রসঙ্গত, বালাকোটে বিমান হামলার পর মোদী বলেছিলেন, দেশ এখন সুরক্ষিত হাতে রয়েছে।

রামকিষান ধাবেল নামে আরেক কৃষক বলেন, পাকিস্তানকে একটা শিক্ষা দিলে নরেন্দ্র মোদীকেই তিনি ভোট দেবেন। তার মতে, দেশের নিরাপত্তার জন্য মোদী সরকার কড়া পদক্ষেপ নিলে তিনি বিজেপিকেই ভোট দেবেন। বালাকোটে হামলার দিনই কর্নাটকে বিজেপির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিএস ইয়েদুরাপ্পা জানান, লোকসভা নির্বাচনের আগে বিমান হামলা বিজেপির পালে হাওয়া লাগাবে। শুধু কর্নাটকেই বিজেপি ২২টির বেশি আসন পাবে বলে বিশ্বাস তার। এ বক্তব্যের পর কড়া সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। দলের ভেতর থেকেও সমালোচনা করা হয়। প্রতিমন্ত্রী জেনারেল ভিকে সিং বলেন, দেশ ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য সরকার হামলা করেছে। নির্বাচনে বেশি আসনে জয়ের জন্য নয়।

পাকিস্তানে হামলার আগে করা বিভিন্ন নির্বাচনী জরিপে দেখা যায়, মন্থর অর্থনীতি, ব্যাপক বেকারত্ব ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণে এবারের নির্বাচনে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে বিজেপি ২৯টি আসনে জয় পেতে পারে বলে জরিপে উঠে আসে। কিন্তু পাকিস্তানে বিমান হামলার পর ইন্ডিয়া টিভি-সিএনএক্স এর করা এক জরিপে দেখা গেছে, উত্তর প্রদেশে ৮০ আসনের মধ্যে ৪১টি জয় পেতে পারে বিজেপি। যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তারা ৭৩টি আসনে জয় পেয়েছিল।

বিরোধী দল কংগ্রেসের করা এক জরিপের ফলও একই রকম। আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মাটিতে হামলার আগে বলা হচ্ছিলো লোকসভা নির্বাচনে গতবারের চেয়ে ১০০-র বেশি আসন কমবে বিজেপির। কিন্তু সেনা হামলার পর মোদী যেভাবে জাতীয়তাবাদের তাস খেলতে শুরু করেছেন, তাতে পূর্বের ধারণার চেয়ে ৪০টির মতো আসন বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অর্থাত্ পাকিস্তানে হামলার আগে বিজেপি যদি ১৮০টির মতো আসন পেত, সেটি এখন ২২০-র কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। মোদীর এই নব উত্থানে নতুন করে কৌশল সাজাতে হচ্ছে বিরোধীদেরও।