প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন ২০১৫

নতুন প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে

 
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে আর নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং বলা চলে পুরোনো এবং একই সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সমস্যা এবং তার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে ইউএনএফসিসিসি ‘কনফারেন্স অব পার্টিস’ নামক এক কমিটি গঠন করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে সমাধানে আসে।
 
১৯৯৫ সালের মার্চে এই কমিটির প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় জার্মানির বার্লিনে। এরপর থেকে প্রতি বছর কমিটির সদস্যরা জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশে সম্মেলনে একত্রিত হন এবং জলবায়ু বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। প্রতিটি সম্মেলনে প্রতিটি পার্টি ‘ন্যাশনাল কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড এমিশন ইনভেন্টরি’ রিপোর্ট জমা দেয়। সেই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে এই সম্মেলনের মূলনীতির কতটুকু অগ্রগতি হলো তা খতিয়ে দেখা হয় এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
 
প্রশ্ন আসতেই পারে, কেন এবারের ২১তম সম্মেলনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ২০ বছর ধরেই পৃথিবীর বড় কর্তাব্যক্তিরা তাদের দেশে, তথা সমগ্র বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করার জন্য আলোচনা করে চলেছে। অনেক সভা-সম্মেলন হয়েছে এ বিষয়ে। তবে এই প্রথম ১৯৬টি দেশের পার্টি একসাথে হচ্ছে এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে জোরালো ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে। প্রতিবারই রিপোর্ট দেখে একটি পরবর্তী কর্মকাণ্ড ঠিক করে নেওয়া হয় এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা হয়। এবার প্যারিসে সব দেশের পার্টি সম্মিলিতভাবে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে, যা এই বছরের সম্মেলনকে পূর্ববর্তী সম্মেলনগুলো থেকে আলাদা করছে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে উপস্থিত সবগুলো দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সবাই একটি বিষয়ে একমত—জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সবাইকে একজোটে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা, তথা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঠেকানো কখনোই সম্ভব নয়। অবশেষে আজ সবাই একমত যে জলবায়ুর পরিবর্তন বর্তমান যুগের এক স্বীকৃত নির্মম সত্য ও বাস্তব ঘটনা।
 
প্রতিবছর যে আলোচনা হয় তাতে প্রতিটি দেশে কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করার জন্য সময় ছিল ২০১৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত। এই কর্মকাণ্ডগুলোকে বলা হতো ‘ইনটেন্ডেড ন্যাশনালি ডিটারমাইনড কন্ট্রিবিউশনস’। এই কর্মকাণ্ডগুলো ছিল মূলত ২০২০-২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে একটি দেশের মূলনীতি। আইএনডিসি বর্তমানে ইঙ্গিত করছে, পৃথিবীতে ফসিল ফুয়েলের মাত্রা শেষ হয়ে আসছে এবং অধিকাংশ দেশে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মাত্রা বাড়ছে। এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গমন কিছুটা হলেও কমানো এবং এর ফলে তাপমাত্রার যে পরিবর্তন হচ্ছে তার হ্রাস করা। এ বছরের চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রতিটি কর্মকাণ্ড যাতে যথাযথভাবে পালন করা হয় সেজন্য আরও কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর সাথে আইনি যত কর্মকাণ্ড জড়িয়ে আছে সেগুলোও সম্পন্ন করা হবে।
 
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা দৈনন্দিন জীবনে কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি, এর উদাহরণ শুরু করলে শেষ হবে না হয়তো। আমাদের জীবিকা, অর্থনীতি, পানি, খাদ্য ব্যবস্থা সবই প্রায় ধ্বংসের পথে। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো মনে হয় না এর সাথে জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই এক সমস্যার কারণে শুধু মানবজীবন নয়, ধ্বংসের মুখে পড়েছে পশু-পাখির জীবনও। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য এবারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও শক্ত চুক্তি পৃথিবীতে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে, তেমনি মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতেও সাহায্য করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে এই চুক্তি বিশ্বের দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা ও মজবুত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি করার পেছনে কাজ করবে।
 
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, ‘আমাদের এই প্রজন্মই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য শেষ প্রজন্ম। আমাদেরই এর জন্য কাজ করতে হবে। আমরা যদি আগামীর জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকি তাহলে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে দেখা দেবে ভবিষ্যতে, যা সমাধান করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের উচিত জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যা নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। এই সম্মেলন আমাদের শেষ সুযোগ, সুতরাং এখনই সময় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার।’
 
প্রতিবছরই জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে অনেক সভা-সম্মেলন হয়। গতবছরই ওবামা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, মার্কিন কার্বন নির্গমন আগামী দশ বছরের মধ্যে ২৮ শতাংশ কমানো হবে। অন্যদিকে শি ঘোষণা করেন যে, চীন ২০৩০ সালে অথবা তার আগেই কার্বন নির্গমন সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু সেই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছে তা জানা নেই। এই সমস্যা একদিনে সমাধান করার নয়। বহুদিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। আর সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সেই একতারই এক নিদর্শন প্যারিসের এবারের সম্মেলন। বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ লেখক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘মানুষ তর্ক করে, ইতোমধ্যে প্রকৃতি কর্ম করে।’ আশা করা যাচ্ছে, প্রকৃতি আরেকবার বিরুদ্ধাচরণ করার আগেই পৃথিবীর বাসিন্দারা কোনো সমাধান বের করতে পারবে। সেই আশায় সবার চোখ এখন প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনের দিকে।
 
লেখক : প্রকাশক ও কার্যনির্বাহী পরিচালক, দৈনিক ইত্তেফাক।