জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ৬৯ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থ সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিএফসি) এর কাছে এই অনুদান সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। ২০৩০ সাল পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হবে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে চলমান জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনের অর্থায়ন সংক্রান্ত আলোচনা পর্ব যখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে ঠিক তখনই বাংলাদেশ এই আর্থিক অনুদান চায়।
বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামালুদ্দিন আহমেদ প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা (আইএনডিসি) উপস্থাপন করার সময় এ অনুদানের বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন। এবারের সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১৮৫টি দেশই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় তাদের নিজস্ব জাতীয় পরিকল্পনা (আইএনডিসি) উপস্থাপন করেছে।
প্যারিস সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলো প্রস্তাব দেয় উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও জলবায়ু তহবিলে অর্থ অনুদান দিতে হবে। আর সেসময়ই ৬৯ বিলিয়ন ডলার অনুদান চেয়ে একটি প্রস্তাব হাজির করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জানিয়েছে অনুদানের ৪২ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার খরচ করা হবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ-খাওয়াতে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে। আর বাকী ২৭ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার খরচ করা হবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি লাঘবে।
গত বুধবার রাতে এ বিষয়ে এক বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘তোমরা, উন্নত দেশগুলোই গত ২০০ বছর ধরে বিশ্ব জলবায়ুকে আমাদের জন্য বিপর্যয়কর করে তুলেছ। আর আমরা এখন তোমাদের কর্মকাণ্ডের চরম কুফলগুলো ভোগ করছি’।
এরপর তিনি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বর্ধিতহারে আর্থিক অনুদানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কুফলগুলো থেকে বাঁচার জন্যই আমাদের এই অর্থের প্রয়োজন’।
এর আগে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, আমাদের লক্ষ্য হল জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সংশ্লিষ্ট চলমান ও ভবিষ্যত প্রকল্পগুলোর জন্য যতটা বেশি সম্ভব আর্থিক অনুদান সংগ্রহ করা।
বাংলাদেশ এর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনা প্রস্তাবে (আইএনডিসি) উল্লেখ করেছে যে, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ অলস বসে নেই। বরং বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই গত ৩০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার খরচ করেছে। এ খাতে বাংলাদেশ ৪০ কোটি ডলারের একটি নিজস্ব তহবিলও (ক্লাইমেট ট্রাস্ট ফান্ড) গঠন করেছে। ওই তহবিল থেকেই ২৩৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এসব প্রকল্পের ৪০টি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাধ নির্মাণ, ঘুর্নিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, খাল পুনর্খনন, লবনাক্ত পানি সহনীয় ধানের বীজ উদ্ভাবন, পুনর্বনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার উত্সাহিতকরন এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি প্রভৃতি।
ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গঠিত তহবিলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও অর্থ প্রদান করতে হবে বলে যে প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন এর কারণে অর্থায়ন সংক্রান্ত আলোচনা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। চলমান প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো তাদের দায় এড়িয়ে যেতে চাইছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জাতিসংঘে গৃহীত জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সংক্রান্ত কাঠামো সনদে (ইউএনএফসিসিসি) কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ-খাওয়ানোর জন্য গরীব দেশগুলো ধনী দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০০৯ সালে ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর গরীব দেশগুলোকে তারা ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলার করে দিবে। কিন্তু ধনী দেশগুলো তাদের ওই প্রতিশ্রুতি পালনে এখন গড়িমসি শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।