বাঙালি জাতির গৌরবের মাস ডিসেম্বর। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই মানচিত্রে আমাদের প্রণম্য মুক্তিযোদ্ধা তারকাদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবছর বিজয়ের মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে শিল্পী-কুশলীদের লেখা বা স্মৃতিগদ্য ছেপে থাকি। এ বছরে পুরো মাসজুড়ে তারকাদের বয়ানে থাকবে তাদের দেখা যুদ্ধকালীন খণ্ডচিত্র। এ নিয়েই পুরো ডিসেম্বরের আয়োজন ‘সেই সময়’। আজ লিখেছেন প্রখ্যাত চিত্রনায়ক উজ্জল
আমার দ্বিতীয় ছবি রিলিজ হওয়ার কথা ছিল ১৯৭১-এর ২ মার্চ। তার কাছাকাছি সময়ে ‘মেঘের পর মেঘ’ ছবির শুটিংয়ে লাহোর ছিলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ‘নন কো অপারেশন মুভমেন্ট’ ঘোষণা করলেন। সবাইকে তিনি অফিস-আদালতে কাজ-কর্ম করা, ট্যাক্স-ভ্যাট দেওয়া বন্ধ করতে বললেন। ৭ মার্চ থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে। খবরটি শুনে ওই রাতে টানা ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা শুটিং করে অনেক কষ্ট করে বিমানের একটা টিকিট ব্যবস্থা করে ঢাকায় চলে এলাম। ঢাকায় এসে দেখি সব স্থগিত, কোনো কাজ করার সুযোগ নেই। তারপর রাজশাহীতে চলে গেলাম। আমার সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মহসীন মল্টু’র ছোট ভাই হাসান ছিল। আমরা দু’জন মিলে ২৫ মার্চ সকালে আমার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ গেলাম। এই দিন শেষে কালোরাত্রি। আমরা তো গ্রামে, কিছুই জানি না। পরদিন ২৬ মার্চ সকালে ঢাকায় আসবো প্ল্যান করেছি। তখনই রেডিওতে কালোরাত্রির সংবাদটি শুনি। আমাদের সব আত্মীয়-স্বজন মিলে আমাদের পুটিয়া গ্রামে চলে গেলাম।
বিকেলে বসে আছি, সেখানে হঠাত্ করে মর্টারশেল এসে পড়লো। সেখানে অধিকাংশই ছিল মেয়ে ও ছোট ছোট ছেলেরা। আমরা সবাই মিলে এই গ্রামের আরও অভ্যন্তরে ঢুকে গেলাম। তখন পুরোপুরি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরা ঠিকভাবে পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারলাম না, আসলে কী ঘটছে। কিছুদিন যাওয়ার পর আমি আর হাসান সিদ্ধান্ত নিলাম, কী হচ্ছে জানতে হবে। ঢাকায় যাবো। তো ঢাকায় রওয়ানা হলাম। টঙ্গী এসে গাড়ি থেমে গেল। সেখানে মিলিশিয়া বাহিনী ছিল। সেখানকার লোকজন বললো, ‘এই বাহিনীর কোনো দয়া-মায়া নেই। যত তাড়াতাড়ি পারো কেটে পড়ো।’
আমাদের দু’জনকে দেখতে ভার্সিটির ছাত্রের মতো মনে হয়। তাই আরও বেশি ভয়। পরদিন সকালে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম এবং ঢাকায় এসে পৌঁছলাম। দেখলাম পুরো ঢাকা জনমানব শূন্য। থমথমে ভাব। হাসান চলে গেল নদীর ওপাড়ে কোনো এক কাজে। আমি একাই থেকে গেলাম। ওদিক দিয়ে আমাদের সিরাজগঞ্জের বাড়ি-ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, আত্মীয়-স্বজনরা সবাই ঢাকায় চলে আসছে।
আমি মগবাজারের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, বাবা-মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে সেই বাড়িতে উঠলাম। সেখানে মুহম্মদ আব্দুর জব্বার নামেও এক লোক থাকতেন। তিনি ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি গাইতেন। তার এই গান গাওয়ার তথ্য মিলিটারিদের কাছে পৌঁছে যায়।
আমি ওই বাসায় থাকার আগে আব্দুর জব্বার থাকতেন, এখন থাকেন না। কিন্তু মিলিটারিদের কাছে তথ্য গেছে এই বাসায় ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানের শিল্পী ফিরে এসেছে। পরদিন মিলিটারিরা বাসায় আসে এবং আব্বু-আম্মুকে গানপয়েন্টে রেখে জিজ্ঞেস করে আমি কোথায়। পরে একটা সময় মিলিটারিদের বুঝাতে সক্ষম হয় সেই লোকটি আমি নই। মিলিটারিরা চলে যায়।
রাতে বাসায় ফিরে শুনলাম মিলিটারিদের এই ঘটনা। সাথে সাথেই আমরা এই বাসা ছেড়ে চলে যাই এবং পরদিন এই বাড়িতে প্রচুর গুলিবর্ষণ হয়।