‘আমাদের ত্যাগ ছিল ইতিহাসের যেকোনো ত্যাগের চেয়ে অধিক’

বাঙালি জাতির গৌরবের মাস ডিসেম্বর। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই মানচিত্রে আমাদের প্রণম্য মুক্তিযোদ্ধা তারকাদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবছর বিজয়ের মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে শিল্পী-কুশলীদের লেখা বা স্মৃতিগদ্য ছেপে থাকি। এ বছরে পুরো মাসজুড়ে তারকাদের বয়ানে থাকবে তাদের দেখা যুদ্ধকালীন খণ্ডচিত্র। এ নিয়েই পুরো ডিসেম্বরের আয়োজন ‘সেই সময়’। আজ লিখেছেন চিত্রনায়ক, পরিচালক ও প্রযোজক

 
মাসুদ পারভেজ
 
১৯৬৫ সালে আমি বৃহত্তর ময়মনসিংহে ছিলাম। এরপর ১৯৬৬-তে ঢাকায় আসি, উঠি ঢাবির ইকবাল হলে। সেখান থেকেই নিজেকে জড়িয়ে নিই ছাত্র রাজনীতিতে, যোগ দিই বঙ্গবন্ধুর সাথে। সিরাজুল ইসলাম, তোফায়েল আহমেদ, ওবায়দুর রহমান, আমির হেসেন আমু, সৈয়দ শাহজাহান আলী বাকীসহ ঢাকার সব ছাত্র ও শ্রমিক নেতা সেখানে একত্রিত হতো। আর সেখান থেকেই পরবর্তী কার্যক্রম ও বিভিন্ন তথ্য-কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া হতো। ইকবাল হলই ছিল স্বাধীনতা শব্দের বীজ। সময়টা ছিল মুক্তির উন্মাদনায় ভরা। প্রতিটি দিনই আমরা যেন এগিয়ে যাচ্ছিলাম স্বাধীনতার দিকে। কিন্তু এ দেশের প্রতিটা মানুষের বুকে ছিল স্বাধীনতার তুমুল স্পৃহা। কারণ, এ দেশের মানুষ ছিল সার্বিকভাবে বঞ্চিত। তখন প্রশাসনিক উচ্চ পদে কোনো বাঙালিদের রাখা হতো না। আর্মিতেও মেজর পদে কোনো বাঙালি ছিল না।
 
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের সাথে বিভিন্নভাবে দাবি আদায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এক পর্যায়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলেন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রায় সব আসনেই জয়ী হলেন। এই জয় স্বাধীনতাকে অনেকটা সহজ করে দেয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার নীরব ঘোষণা হয়ে গেল, এটা পাকিস্তানিরাও বুঝতে পেরেছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে আমি ও মোস্তফা মহসিনসহ অনেকেই ইকবাল হলে ছিলাম। ওই রাতে পাকিস্তানি হানাদারদের হামলা শুরুর পর আমরা হলের সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হলো। প্রাণের ভয়ে শিক্ষার্থীরা যে যার মতো করে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেছিল।
 
আমি তখন কেরানীগঞ্জে এক লোকের বাড়িতে দু’রাত আশ্রয়ে ছিলাম। আসলে স্বাধীনতার পক্ষেই এ দেশের সব মানুষ ছিল। বিপক্ষে যারা ছিল তাদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে উল্লেখ করার মতো নয়। কারণ, দেশের স্বাধীনতা ছিল সব মানুষের একান্ত স্বপ্ন। দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের মাঝেই স্বাধীনতার স্বপ্নটা অনেক বেশি জীবন্ত ছিল। আর এ কারণেই আমরা যুদ্ধটা জয় করতে পেরেছি। যদিও খুব একটা সহজ ছিল না এই জয়। এর বিনিময় আমাদের ত্যাগ ছিল ইতিহাসের যেকোনো ত্যাগের চেয়ে অধিক।
 

যদিও আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলতে হয়, ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীনতা, তাও আজ ৪০ বছর হয়ে গেল। যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা তো চলেই গেছেন। কিন্তু যারা আহত হয়ে বেঁচে আছেন তাদের আজ কি অবস্থা! তাদের নাম দেওয়া হয়েছে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা। তাদের জন্য না আছে কোনো হাসপাতালে ভালো কোনো চিকিত্সার ব্যবস্থা, না আছে রেল, লঞ্চ, বিমানে আসনের ব্যবস্থা।