বাঙালি জাতির গৌরবের মাস ডিসেম্বর। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই মানচিত্রে আমাদের প্রণম্য মুক্তিযোদ্ধা তারকাদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবছর বিজয়ের মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে শিল্পী-কুশলীদের লেখা বা স্মৃতিগদ্য ছেপে থাকি। এ বছরে পুরো মাসজুড়ে তারকাদের বয়ানে থাকবে তাদের দেখা যুদ্ধকালীন খণ্ডচিত্র। এ নিয়েই পুরো ডিসেম্বরের আয়োজন ‘সেই সময়’। আজ লিখেছেন দেশের বরেণ্য অভিনেতা ও পরিচালক আবুল হায়াত
১৯৭১ সালটিই ছিল ভয়াবহ একটি বছর। প্রতিটি দিনই অনেক আতঙ্ক আর ভয় নিয়ে কাটাতে হয়েছে। পুরো যুদ্ধতেই আমি ঢাকায় ছিলাম। আমার বাসা ছিল মালিবাগ। যুদ্ধ চলাকালীন যদি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে এমন কিছু বলতে চাই, তাহলে ডিসেম্বরের ২ থেকে ৩ তারিখে একটি ঘটনা ঘটেছে সেটি বলতে হয়। যা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক ঘটনা ছিল। মালিবাগ আমার বাড়ির সামনে একটি ট্রান্সফর্মার বিষ্ফোরিত হলো। তখন রাত ১০টার মতো বাজে, মিলিটারিরা যেখানে যাকে পাচ্ছে তাকেই ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে মিলিটারিরা আমাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে রাস্তায় এনে দাঁড় করালো। খুব ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। আমার মতো অনেক বাঙালিকে এনে রাস্তায় লাইন ধরিয়ে দাঁড় করালো। আমি তখন ভেবেছি, এ যাত্রায় আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই। পুরোপুরি শেষ। সবার মাঝেই একই ভাবনা। আমরা কোনো শব্দও করতে পারছিলাম না। প্রতিটি বাঙালির চোখে-মুখে ভয় আর মৃতুকে সামনে দেখতে পাচ্ছে এমন ভাব। ওই মিলিটারি বাহিনীর এক মেজর এলো। এসে একজন একজন করে বাঙালিকে জিজ্ঞেস করছে নাম ও পেশা। নাম ও পেশা জানার পর এই লাইন থেকে নিয়ে নতুন আরও দুইটি লাইন করে একেক জনকে একেক লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। আমি তখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে, আমাদের গুলি করে মেরে ফেলবে। এই লাইনের মধ্যে একের পর এক শেষ করে আমার দিকে আসছে। যত কাছে আসছে ততোই বুকের কাঁপুনিটা বাড়ছে। এবার আমার পালা। আমাকে এসে ওই মেজর জিজ্ঞেস করলো, ‘নাম কেয়া হ্যায়?’ আমি বললাম, আবুল হায়াত। তারপর জিজ্ঞেস করলো, ‘কাম কেয়া?’ আমি বললাম, পানি ইঞ্জিনিয়ার। এই কথা শুনে মেজর বললো, ‘পানিকা ইঞ্জিনিয়ার। পানিকা ইঞ্জিনিয়ারসে হামারা কেয়া লেনাদেনা।’ তার পাশের এক মিলিটারিকে ধমক দিলো এবং বললো, ‘তুমলোগ কেয়া কাররাহাহু, পানিকা ইঞ্জিনিয়ার কিও পাকড়া। ইসে ছুরদো।’ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। সে বারবার ওই মিলিটারিকে ধমকাচ্ছে, আর আমাকে চলে যেতে বলছে। আমি নড়ছিও না, ভাবছি আমি এখন চলতে শুরু করলেই পেছন থেকে গুলি করে মেরে ফেলবে। ওই মেজরের আদেশানুযায়ী আমি হাঁটতে শুরু করলাম। খুব অন্ধকার। মনে হচ্ছে, এই বুঝি পেছন থেকে গুলি করলো। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে বাসায় চলে গেলাম।